জোড়াতালিতে মার্টিন পার

অনুবাদ
প্রজ্ঞা তাসনুভা রুবাইয়াত

.
প্রশ্ন: আপনি একজন ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফার, অথচ আপনাকে বাণিজ্যিক কাজের ব্যাপারেও অনুৎসাহী বলে মনে হয় না।

মার্টিন পার: না, একেবারেই না! ফটোগ্রাফি আসলেই একটা বাণিজ্যিক কাজ। এমনকি হাই আর্ট ফটোগ্রাফিও এইটার বাইরে না, তারাও প্রিন্ট বিক্রি করতে চায়! আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, এখন যদি আপনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ফটোগ্রাফারের কথা ভাবেন, দেখবেন যে সেইটা ফ্যাশন ফটোগ্রাফার স্টিভেন মিজেল না, আন্দ্রে[?] গার্স্কি, যিনি কিন্তু এখন আর্ট মার্কেটে সবার উপরে আছেন। মজার ব্যাপার হল যে আর্ট মার্কেটকে অর্থনৈতিক ভাবে অধিকাংশ সময়েই, বাণিজ্যের দরিদ্র ভাই হিশাবে দেখা হয়, সেটাই এখন ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকেও অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে! আপনি যে কোন ফটোগ্রাফারকে জিজ্ঞেস করে দেখেন সে কি করতে চায়, দেখবেন তারা হয়ত বলবেঃ আমি আমার নিজের মত কাজ করতে চাই, আমি আমার কাজ প্রিন্ট হিশাবে বেচতে চাই। আলটিমেটলি, এইটা কিন্তু একটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যই। সুতরাং, আমরা কখন্ওই এই বাণিজ্যিক ব্যাপার স্যাপার থেকে দূরে থাকতে পারব না।

 

প্রশ্ন: কিন্তু, শিল্পের ওপর অর্থনীতি যে কর্তৃত্ব করছে, আপনার কি মনে হয় না এইটা প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে আপনি এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন?

মার্টিন পার: কেন প্রত্যাখ্যান করতে চান, আমি সেটার কোন কারণ দেখি না। বাণিজ্যই কিন্তু সব ঘটনা ঘটাইতেছে। যদি জনসংখ্যার এক শতাংশের কথা ধরে বলা যায়, তবে তাদের কেউই সরকারি ভর্তুকি পাওয়া ঘেট্টোতে বসবাস করতে রাজি হবে না। ফটোগ্রাফিরই সেই ক্ষমতা আছে যে সে একইসাথে গণতান্ত্রিক, বাছ বিচারহীন, এমনকি মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্যও হতে পারে। যদি আপনার ঘেট্টো’র বাইরে বের হয়ে আসতে হয়, তাহলে আপনাকে বাণিজ্যিক বৃত্তের মধ্যে ঢুকতেই হবে। এই যে ফ্যাশন জগতের মানুষগুলা, বিজ্ঞাপন, পোস্টার, বিলবোর্ড এইগুলোতে আর কি। আর এইগুলাও আসলে আরেক ধরনের ঘেট্টো। এই দলটা আকারে একটু বড় আর কি। আপনি এইটাও বলতে পারেন যে, ভিজ্যুয়াল কালচারটাও একটা ঘেট্টো, কিন্তু আমাদের অবস্থান এইটার ভিতরেই। আপনি যদি পশ্চিমা দুনিয়াতে থাকেন, দেখবেন সেইখানে কেউই এইটার বাইরে না। আমাদের দুনিয়ার চারপাশ চিত্র দিয়ে ঘেরা, সেইটা অ্যাডভার্টাইজিংই হোক, আর ফ্যামিলি স্ন্যাপশটই হোক। মাথায় রাখা দরকার সবাই কিন্তু এখন ফটোগ্রাফার। এইটা অবশ্যই ফটোগ্রাফির একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। আর, সবসময়ই এর দর্শক বাড়া দরকার আর লোকজন যখন ফটোগ্রাফির ব্যবহার শুরুই করে, তখন এর মাঝে একটু বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করলে খারাপ কি!

প্রশ্ন: এইসব ‘ইমেজ ফ্লো’ এর বেশিরভাগই তো খুব গতানুগতিক, আপনি প্রায়ই এই বিষয়ে প্রপাগান্ডা শব্দটা ব্যবহার করেন। একটু ভেঙে বলবেন, এইটা দিয়ে আপনি কি বোঝাতে চান?

মার্টিন পার: যেসব ইমেজ আমরা দেখি তার বেশির ভাগই এক ধরনের প্রপাগান্ডা, কারণ প্রতিটা ইমেজেরই একটা এজেন্ডা থাকে। বিজ্ঞাপনী কিংবা বাণিজ্যিক জগতের ক্ষেত্রে কেবল বিক্রি হওয়াটাই ফটোগ্রাফির একমাত্র উপযোগিতা, যদিও সকল ফটোগ্রাফিরই একটা এজেন্ডা থাকে। অথবা ফ্যামিলি স্ন্যাপশটের ক্ষেত্রে বিষয়টা হল একটা ‘পারফেক্ট ফ্যামিলির’ ধারণা বিক্রি করা। আমি এইটা বলছি না যে, ইনডিপেন্ডেন্ট ফটোগ্রাফারদের কোন এজেন্ডা নাই, কারণ নিশ্চিতভাবে তাদেরও একটা এজেন্ডা থাকেঃ আপনি দুইজন ফটোগ্রাফারকে একই শহরে পাঠিয়ে দেখতে পারেন, দেখবেন তারা দুইজনই একে অপরের থেকে একদমই ভিন্ন কাজ নিয়ে আসবে। দেখা যাবে একজনের কাজ হবে খুবই ইতিবাচক, আরেকজনেরটা হবে একেবারেই নেতিবাচক।

প্রশ্ন: অনেক শিল্পীই ইদানিং ফটোগ্রাফিকে একটা কনসেপচুয়াল মিডিয়াম হিশাবে ব্যবহার করেনঃ বোঝাই যায় যে, তারা ছবিটার ব্যাপারে আগ্রহী এবং সেই ছবির প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। কিন্তু তারা সেই ছবির গঠন কিংবা কৌশলগত বিষয়ে খুব দৃঢ়ভাবে আগ্রহী হননা, এমনকি ফটোগ্রাফির ইতিহাস এবং সেখানে তাদের অবস্থানের ব্যাপারেও না। একটু আগেই আপনি বললেন, ছবি তোলাটা এখন খুব সহজ, সেটাও একটা কারণ। আপনি কি খেয়াল করেছেন, কিংবা ভেবেছেন যখন ফটোগ্রাফি শিল্প জগতের সাথে মিশে গেছে, তখনই কিছু একটা পরিবর্তন ঘটেছে?
মার্টিন পার: নিশ্চিতভাবে। এখন যেভাবে আপনারা ফটোগ্রাফিকে দেখেন, তাতে একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটে গেছে। দশ বছর আগেও টেট গ্যালারি ফটোগ্রাফ কিনত না, যদি না সেটা একজন শিল্পীর করা হত, কিন্তু এখন তারা অন্যান্য লোকজনের কাছ থেকে ছবি কেনে এমনকি আমার মত লোকের কাছ থেকেও। এইটা তাদের পরিচালনা নীতির বিশাল পরিবর্তন। এখন যদি আপনি একটা আর্ট ফেয়ারে যান, এক তৃতীয়াংশ ছবিই হল ফটোগ্রাফি।

প্রশ্ন: ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফারদের লক্ষ্য কিভাবে পরিবর্তন হচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?

মার্টিন পার: লাইফ ম্যাগাজিন কিংবা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এর কালার সাপ্লিমেন্টগুলোর মত প্রচলিত যেসব ফটোজার্নালিস্টিক পত্রিকাগুলো ছিল এগুলোর কাটতি ক্রমশ পড়তির দিকে। ফলে আপনি যদি একজন ফটোজার্নালিস্ট হন (মনে রাখবেন আমি কিন্তু একজন ফটোজার্নালিস্ট না), আপনাকে অনেক পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। আপনার সামনে এগোনোর জন্য দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে। আর আপনার যদি শক্তিশালী কাজ থাকে তাহলে বিশ্বাস রাখতে হবে যে কিছু মানুষ আছে যারা আপনার ছবি ছাপাবে। কিন্তু আপনার কমিশন পাওয়া এবং পত্রিকার কাজ ছাপানো তার থেকে অনেক কঠিন। সে জন্যই ম্যাগনামের মত এজেন্সিগুলো বেশ ভাল করছে কারণ তারা এটা বুঝতে পারছে যে, ফটোগ্রাফির ভবিষ্যৎ শুধু পত্রিকার পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটার সাথে মিউজিয়াম কিংবা ভ্রাম্যমান প্রদর্শনীর মত অন্যান্য কালচারাল ভেন্যুও যুক্ত হবে।

সংকলন- মুনেম ওয়াসিফ ও তানজিম ওয়াহাব

 

 

ঘুম যখন বিরতি

আলাপচারিতা- শহিদুল আলম

মুনেম ওয়াসিফ

 

স্যালন থেকে সোশাল

মুনেম ওয়াসিফ: তো আপনি বিপিএস ছাইড়া দৃক করলেন কেন? আপনি ফটোগ্রাফি নিয়া অন্য কিছু ভাবসিলেন যেইটা বিপিএস এ করা সম্ভব ছিল না?

শহিদুল আলম: বিপিএস নিয়ে আমার কোনই সমস্যা ছিল না। বিপিএস আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এবং আমি প্রতিষ্ঠানটাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। যেটা আমার কাছে পরিষ্কার ছিল যে, বিপিএস এর বাইরেও একটা জগত আছে। যদিও বা আমি এই ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি বা কিছু কিছু মাধ্যমে এই বাইরের জগতের সাথে পরিচিত করার চেষ্টা করেছি, এইটা একটা শৌখিন আলকচিত্রীদের জায়গাই ছিল। পেশাজীবী আলোকচিত্রীদের জায়গা সত্যিকার অর্থে ছিল না। সুন্দর ছবি করা ছিল বিপিএস এর আকর্ষণ, ছবির মাধ্যমে যে একটা কাজ করা সম্ভব সেইটা না। সমাজ পরিবর্তন, ছবির মাধ্যমে একটা আন্দোলন করা, ছবির মাধ্যমে একটা বক্তব্য প্রকাশ করা, ছবির মাধ্যমে প্রতিবাদ করা-এই বিষয়গুলো বিপিএস-এর ছিল না। এটাকে ভাল-খারাপ বলছিনা, বিপিএস এর এই জায়গাটাই ছিল না। এটা একটা দিক। আরেকটা হল, আমি যখন পাশ্চাত্যে বাংলাদেশকে কিভাবে দেখা হয় সেটা দেখি, সেখানে বাংলাদেশকে খুব নেতিবাচক ভাবেই দেখা হত। এখনও অনেক ক্ষেত্রে দেখা হয়। এবং এটা পরিবর্তন করার ব্যাপারে আমাদের কোন ভূমিকাই নেয়া হত না। যদিও বিপিএস সাংবাদিকতা করত না, কিন্তু যেই ক¤পিটিশনগুলো ওরা করত, সেখানে সুন্দর ছবি যেমন যেত, দারিদ্র্যও তেমনি থাকত। কিন্তু জীবন সম্বন্ধে বলার জায়গাগুলি সেভাবে ছিল না। তখন মনে হল স¤পূরক একটা কিছু হওয়া দরকার। বিপিএস গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, সেটা ঠিক আছে। সেই সাথে স¤পূরক একটা কিছু থাকা দরকার যেখানে আলোকচিত্রটাকে পেশা হিশাবে নেয়া যাবে। যেখানে সত্যিকার অর্থে পেশাজীবীদের জন্য একটা মঞ্চ তৈরি হবে। যেখান থেকে তারা তাদের কাজ দেখাতে পারবে, ছবির একটা ভাষা আসবে, এবং তারা ছবির মাধ্যমে প্রতিবাদও করতে পারবে। সেই রকম চিন্তা থেকেই দৃক শুরু।

 

মুনেম ওয়াসিফ: দৃক এর প্রথম দিকের কিছু ক্যালেন্ডার দেখলে বলা যায় যে আপনি সুন্দর বাংলাদেশের ছবি থেকে আস্তে আস্তে সরে আসছিলেন, যেখানে শ্রেণী বৈষম্য, লিঙ্গীয় অসমতা, নানান রাজনৈতিক অস্থিরতার ছবি উঠে আসছিল। আপনি সোশাল ডকুমেন্টারি বা ফটোজার্নালিস্টিক কাজের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন, যা দিয়ে সমাজকে পরিবর্তন করা যায়? কিন্তু দৃক এর এই সোশাল ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি প্রমোশন ফটোগ্রাফিকে খুব একমুখী করে দিয়েছে? যার ফলে আমরা ৯০’এর দশকে খুব একটা এক্সপেরিমেন্টাল কাজ দেখি নাই। আমি শুধু স্যালন ফটোগ্রাফির কথা বলছি না।

শহিদুল আলম: দৃক যখন শুরু হয় তখন যেই জিনিসটা চেষ্টা করা হয় যে, আমাদের কাজ পৌঁছে দেয়া। তখন শ্রম দেয়া হয় ওই নেটওয়ার্কটা তৈরি করার জন্য। কাঠামো তৈরি করা, আলোকচিত্রীদের একটা ভাল প্রিন্ট করার জায়গার ব্যবস্থা করা। আমরা কিছু কিছু জিনিস করি যা ফটোগ্রাফির সাথে একেবারেই স¤পৃক্ত না, কিন্তু হয়েছিল বলেই এখন ফটোগ্রাফি সম্ভব। আমরা ই-মেইল চালু করি নব্বই দশকের শুরু দিকে। কারণ আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা লন্ডন-প্যারিসে থাকব না, বাংলাদেশেই থাকব, কিন্তু আবার তাদের সাথেই আমাদের লড়াই করতে হবে। সেই লড়াইয়ের হাতিয়ারগুলি তৈরি করা। একটা বড় সময় গেছে আমাদের ওই জিনিসগুলি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে। এবং প্রথম যেই জিনিসগুলি হয়েছে যে দৃকের ক্যালেন্ডারগুলি যখন হয়, তখন দু’টো জিনিস ভিন্ন হয়। তার আগের সকল ক্যালেন্ডার ছিল রঙ্গিন। সাদা-কালো শুধুমাত্র ছাপানো হত বাজেট কম থাকলে। ভাল কাজের জন্যও যে সাদা-কালো হতে পারে, এই বোধ কিন্তু ছিল না। আমরা যখন প্রথম ক্যালেন্ডার করি, সাদা-কালো তো করিই, সেটাকে আমরা আবার স্ক্যান করি। এটা ছিল অদ্ভুত একটা চিন্তা। কারণ সস্তা করার জন্য যেখানে সাদা-কালো করা হয়, প্রসেস ক্যামেরায় সেপারেশন করা হয়, সেখানে স্ক্যানিং-এ গেলে তো রঙ্গিনই করতে পারতাম! এবং আমরা প্রথম ক্যালেন্ডার করি স্ক্যান করে সাদা-কালো এক রঙ্গে। দ্বিতীয় ক্যালেন্ডার করি স্ক্যান করে ডুয়ো-টোন। তৃতীয় ক্যালেন্ডার করি স্ক্যান করে সাদা-কালো ফোর কালারে! এটা তো তখন একটা অদ্ভুত জিনিস! আমি চার রঙ্গেই ছাপাচ্ছি, স্ক্যান করছি, কিন্তু সাদা-কালো ছাপাচ্ছি, ব্যাপারটা কি! এটা বোঝা খুব কঠিন ছিল। এবং তার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আনার প্রয়োজন ছিল কারণ ক্যালেন্ডার সংস্কৃতির মধ্যে ফুল, সুন্দরী মহিলা, মসজিদ বা ল্যান্ডস্কেপ-এই চারটা বিষয়ের বাইরে ক্যালেন্ডারে কোন বিষয়বস্তু হত না! ক্যালেন্ডারের মধ্যেও যে বিষয় আনা সম্ভব, এবং ক্যালেন্ডার যে সাদা-কালো হতে পারে দু’টোই কিন্তু নতুন একটা ব্যাপার।

মুনেম ওয়াসিফ: আপনি দৃক করার কারণে কি বিপিএস বা পূর্ববর্তী ফটোগ্রাফারদের সাথে কি কোন দূরত্ব তৈরি হয়েছিল?

শহিদুল আলম: দৃককে যখন ভিন্নভাবে দাঁড় করানো হয়, সবাই যে এটা বুঝেছে বা পছন্দ করেছে তা-ও না। কারও কারও হয়ত ধারণা ছিল এটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটা জিনিস তো আমরাও করি, যেটা ওরাও করে। যেমন প্রদর্শনী করি, ফটোগ্রাফি ক¤পিটিশন করি, আরও বিভিন্ন ধরনের জিনিস করি। তবে আমরা থেকে থেকেই যৌথভাবে কাজ করেছি। কিছু কিছু জিনিস যেটা আমি মনে করি হয়ত বিপিএস-এরই করা উচিত ছিল, করা হয়নি বলে আমরা করেছি। যেমন, গোলাম কাশেম ড্যাডি এবং মনজুর আলম বেগ এর যৌথ একটা প্রদর্শনী আমাদের এখানে হয়, ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ বলে। এইটা ঠিক যে আমার তখন জায়গা বেশি ছিল, করার সুযোগও বেশি ছিল। তবে শুরুর দিকে দৃক যে ফটোগ্রাফি চর্চার ক্ষেত্রে খুব বেশি ভিন্নতা করেছে তা না। ভিন্ন একটা দিক নিয়ে কাজ করেছে। বিপিএস বিপিএস-এর মতই ছিল এবং সমান্তরালভাবেই কিছুদিন চলেছে। যেটা হয়েছে, যেহেতু আমরা ডকুমেন্টারি কাজ অনেক বেশি করছিলাম তখন ওইদিকে জোর বেশি পড়েছে, অন্যান্য দিক হয়ত তুলনামূলক ভাবে কম হয়েছে। আমাদের আসলে তখন ফটোগ্রাফির প্র্যাকটিস নিয়েও ততটা ব্যস্ততা ছিল না, কাঠামো দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে ছিল।

 

সাদাকালোর রসায়ন

আলাপচারিতা- নাসির আলী মামুন

মুনেম ওয়াসিফ

মুনেম ওয়াসিফ: আচ্ছা তাইলে আপনি প্রথম দিকে, একদম মনে আছে এই যে ধারণাটা আপনার হইল, যে মানুষের চেহারার ছবি তুললে এইটারে পোর্ট্রেট বলে, উপর থেইকা তুললে এইটাকে এরিয়েল ফটোগ্রাফি বলে। প্রথম দিকে আপনি কার পোর্ট্রেট তুলছেন? মানে আপনার বন্ধু-বান্ধব…

নাসির আলী মামুন: আমিতো প্রথম ৬৮/৬৯/৭০ সালের দিকে বন্ধু-বান্ধব, আর ভাই-বোনদের ছবি তুলছি ঘরের মইধ্যে। সেইগুলি অল-মোস্ট স্টুডিওর পাসপোর্ট ছবি মতই আরকি। তাও সেই ছবির মধ্যে আমি খুব চেষ্টা করতাম প্লেইন একটা ওয়ালের সামনে, যেগুলিতে দাগ-টাগ আছে… কিংবা বড় মোটা কোন গাছ, ওরা সবাই ছবি তুলতে চাইত পার্কে গিয়া, রমনা পার্কে যাইতে চাইত, ধানমন্ডি লেকে, যেইটা আমার বাসার থাইকা কাছাকাছি ছিল। এই রকম গেছিও ওদের পীড়াপীড়ির কারণে, ঐখানে গিয়া আমি বড় বড় গাছ খুঁজতাম। বড় বড় গাছের ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি তুললে, গুড়িটা প্লেন একটা ওয়ালের মত দেখা যাইত, পিছের আমি গাছ-পালা কিছু আনতাম না। তাতে ওরা বিরক্ত হইত। ওরা পছন্দ করত ফুলের সামনে… পরে যখন বি টু সাইজের ছবি প্রিন্ট করতাম, খুব পপুলার একটা সাইজ ছিল তখন, এইটা দীর্ঘদিন, এইটিস পর্যন্ত— ছিল বি টু সাইজ। বি টু সাইজ টা এখনকার যে থ্রি আর সাইজটা আছে, ওটা থেইকা একটু ছোট আরকি। তো ওরা দেখলে বিরক্ত হইত কিন্তু আমার দেখতে খুব ভাল লাগত যে প্লেইন, অন্য ট্র্যাডিশনাল ছবির বাইরে। যে ফুল নাই, নদী নাই, লেক নাই, গাছ-পালা নাই, একটা প্লেন ব্যাকগ্রাউন্ড। তো এই রকম আমি মাথার মধ্যে তখনই আসল যে, মানুষের ছবি একটু আলো-আঁধারই রাখলে কিরকম হয়। তখন লেখকদের বই উলটাইতাম আমি, ফ্লপে যে লেখকের ছবি আমি দেখলাম, আমি তারে তো আমি দেখছি গত সপ্তায়, ওমর অনুষ্ঠানে, সে তো এই রকম না। তাঁর গর্ত আছে, সে কালো, কিন্তু মুখ ফোলা তাঁর, ফর্সা, তাঁর বসন্তে—র দাগ ছিল—দাগ নাই। এইটা কেমন? আমি তখন চিন্তা করলাম, না, এই রকম ছবি তো ছবি না। তখন আস্তে আস্তে আমারও চোখ আমি ঘুরাইলাম, যে মানুষের মুখের মধ্যে যা আছে, ক্ষত বিক্ষত এইগুলা সব আনতে হবে, শুধু তাই না, তার যে হৃদয়ের বেদনা, তার যে আনন্দ, তার যে উচ্ছ্বাস সব ছবির মইধ্যে আনতে হবে। তার কষ্ট ছবির মধ্যে থাকতে হবে, থাকা উচিৎ আমি মনে করি, ঐটাই পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি। এবং তখন আমার মনে হইত যে, ও বলত যে স্টুডিও ফটোগ্রাফি একটা সাইনবোর্ড আমি তখন দেখলাম যে, না আমি ত সাইনবোর্ড পেইন্টার হইতে চাই না। সাইনবোর্ড আঁকাইয়া হইতে চাই না।

 

মুনেম ওয়াসিফ: যেই সময়ের আপনি এই ফটোগ্রাফির প্রতি আপনার আগ্রহ ছিল, তখন কি আপনার কোন কবি, সাহিত্যিক কোন বন্ধু-বান্ধব ছিল? আপনি সিদ্ধান্ত—টা কখন নিলেন, যে আপনি এই বিখ্যাত লোকজন এর পিছন ছুটবেন বা এদের ছবি তুলবেন? কারণ ঐ সময়ে আপনি একদম পেসিফিকলি একটা অন্য জায়গায় ছবি তোলা শুরু করলেন এবং আমি যতদূর জানি সেই অর্থে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, বি পি এস, ঐ গুলার সাথেও আপনি সম্পৃক্ত ছিলেন না। আপনি একদম আলাদা, নিজের মত করে কাজ করে গেছেন…

নাসির আলী মামুন: আমি নিজের মত, নিজের স্বতন্ত্র রাস্তা নির্মাণ করার চেষ্টা করছি। ফটোগ্রাফি লেভেলের কেউ ওই ভাবে, মানুষ বলে না যে আপনার গুরু কে? ঐ রকম আমার কেউ নাই। বরঞ্চ এই পর্যন্ত পদে পদে হোঁচট খাইতে খাইতে… শিয়াল, কুমির, সাপের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইতে হইতে এই চল্লিশ বছর বেয়াল্লিশ বছর হইছে ফটোগ্রাফি কইরা আমি আসছি। সত্য কথা বলি—সফল ফটোগ্রাফার হইছি? না আমি হইতে পারি নাই। তোমাদের ছবি দেখলে আমি বুঝি যে, আমি কত ছোট আমি কত পিছে। আমি কোন জায়গায় আছি? আমি পাঠক তো, তারপরেও আমার কৃতিত্বটা কি? এইটা হইল যে, পুরা জাতিরে, প্রিন্ট মিডিয়ারে এবং প্রকাশনা জগতের চোখ এবং তাদের টেস্ট আমি ঘুরাইছি। ঐ চল্লিশ পাঁচ্চল্লিশ বছর আগের লেখকের ছবি বা আর্টিস্টের ছবি, ছবি না। আমি যে ছবি দিতেছি এইটা হইল তার আসল চেহারা। এইটা তার আত্মা, এইটা তার চেহারা, এইটা তার সিগনেচার, এইটা তার ঠিকানা। অন্তত মিডিয়ার লোকেরা এখন বোঝে, আর প্রকাশনা জগতের এরাও বোঝে। তো এদের এই চোখটা আমি ঘুরাইছি। এইটা নিয়া হয়ত বিশ বছর পর কেউ কাজ করলে করবে, যে আমি এই কাজটা প্রথম করছি বাংলাদেশে। আমি ভাল পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি করি নাই। ঐ প্রথম ফটোগ্রাফি থাইকা এই ফটোগ্রাফিতে আসছে, আনছি। মেকি ফটোগ্রাফি, যেটা স্টুডিও ফটোগ্রাফি—যেইটার মধ্যে কোন শিল্প নাই। শিল্পটা কি? তুমি কইতে পার যে শিল্পটা কি? শিল্পটা হইল যে-পরিষ্কার, স্বচ্ছ পানির মধ্যে তুমি একটা লাঠি ঢুকাইছ, সেই লাঠিটা স্বাভাবিক ভাবে মনে হবে যে সোজা, কিন্তু সোজা নাই। পানির মধ্যে যখন দেখবা লাঠিটা বাঁকা হইয়া গেছে ঐটাই শিল্প। সেইটা করার চেষ্টা করছি কিন্তু আমার পোর্ট্রেট সেই রকম হয় নাই, আমার পোর্ট্রেট পানির মধ্যে দেখা যায় সোজাই আসলে। কিন্তু আমি রাস্তাতো বানাইছি। তোমরা এই রাস্তার মধ্যে পিচ দিয়া রাস্তা ঢালাই করবা, এই রাস্তায় তোমরা এখন গাড়ি চালাইতেছ।

মুনেম ওয়াসিফ: কিন্তু বিখ্যাত মানুষের ছবি তুলতে গেলেন কেন? সদর ঘাটের একটা নৌকার মাঝি, বৃদ্ধ একটা চেহারা তার মুখেও ঐ কষ্ট আছে. আপনি তার ছবি না তুলে শামসুর রাহমানের ছবি তুলতে গেলেন কেন?

নাসির আলী মামুন: তার মুখেও কষ্ট আছে, কিন্তু তার আবার মেধা নাই। আমি হইলাম চিরকাল মেধাবী মানুষদের পূজারী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল মানুষ। কবি, সাহিত্যিক, লেখক, অর্থনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, সংগীত শিল্পী, পেইন্টার, আমি সব সময় এদের আচরণে, এদের কথা বার্তায়, জীবন যাপনে এবং এদের কাজ-কর্মেতে অভিভূত হইতাম। সবসময় ফ্যাসিনেটেড, এখনও হই। বিস্ময় ভাবে হই। যেমন যেকোনো মানুষ, বিখ্যাত মানুষকে দেখলেই আমি তাকে প্রথমে এমন একটা পর্যায়ে নিয়া যাই, মানুষের সাথে আলোচনা করতে গেলে, যে সে ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রেটি। না হইলেও আমি কথায় প্রমাণ করার চেষ্টা করি যে, সে ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রেটি। কাজেই আমি এমন একটা ক্যারিসমেটিক জগত নিজের মধ্যে তৈরি করছিলাম যে, ঐটা আমার ব্লাডের মধ্যেই মিশা গেছিল, বিখ্যাত লোক ছাড়া আর কিছু বুঝি না আমি। আর আমার পরিবারের মধ্যে একজন ছিল খুব নামকরা কবি, ছোট বেলা থেইকা তাকেও আমি দেখতাম। তাঁর জীবন-যাপন এই রকম পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে, খালি গাঁয়ে থাকে, লুঙ্গি পইড়া ঘুরতাছে। জসীম উদদ্দিন এর কথা কইতেছি। দেখলাম যে তাঁর সৃষ্টি কর্ম এই রকম, সারা বাংলাদেশের লোক পড়ে, বাংলা সাহিত্যের সবাই পড়ে। পিএইচডি করতাছে, ইউরোপ-আমেরিকায় তাঁর বই নিয়া কাজ হইতাছে, অনুবাদ হইতাছে। আমিতো এদের উপরেই কাজ করব। ছোট বেলায় মনে হইত আর কি। পরে যখন বাহাত্তর সালে আমি ক্যামেরা হাতে নিলাম প্রথম, আমার নিজস্ব^ কোন ক্যামেরা ছিল না। ধার করা ক্যামেরা, তখন আমি কাজে লাগাইলাম-এইসব মানুষদের যে ইমেজ আমার মধ্যে রইছে, সৃষ্টিশীল মানুষ এদের উপর কাজ করব, পোর্ট্রেট করব। এদের দুঃখ, বেদনা এগুলোর উপর কাজ করব।

মুনেম ওয়াসিফ: ধরেন রিচার্ড অ্যাভেডন, হেনরি কিসিজ্ঞারেরও ছবি তুলছে আবার মেরলিন মনরোর ছবি তুলছে। কিন্তু আপনার ছবি দেখলে আমি যেমন দেখি, আপনি খালি অ্যালেন গিনসবার্গ-এর মত মানুষের ছবি তুলছেন। আপনার ছবিতে বিখ্যাত মানুষদের ভিতরে আপনার একটা সিলেকশন আছে। আইদার তারা খুব রুচিবান, অথবা সত্যিকার অর্থেই তারা খুব ইন্টেলেকচুয়াল অথবা তারা আপনার অর্থে ভাল মানুষ। ধরেন খারাপ মানুষও তো বিখ্যাত হয়, আপনে তো সুইডেন আসলামের ছবি তোলেন নাই। তার মানে আপনার এই ভাল মানুষের মধ্যে একটা সিলেকশন আছে। এইটা কি আপনে মনে করেন আপনার ব্যক্তিগত রুচির জায়গা থেইকা তৈরি হইছে?

নাসির আলী মামুন: আচ্ছা, সত্যি বলি, প্রথমত আমার কাছে যারা গুরুত্বপূর্ণ তাদের পোর্ট্রেটই আমি করি। এখন তোমার মনে হইতে পারে… যে বিখ্যাতর কোন সংজ্ঞা নাই। আজকে যে বিখ্যাত, দশ বছর পরে সে দেখা গেল একদম বিখ্যাতই না। আবার আজকে যে বিখ্যাত না তারে হয়ত আমি রিকোগনাইজ করতে পারলাম না। যে রকম আরজ আলী মাতুব্বররে আমরা চিনি নাই। কত ঘুরত বাংলা একাডেমীতে, ন্যাশনাল বুক সেন্টারে ঘুরত, কেউ পাত্তা দিত না। পান খাইত, চা খাইত আর গল্প করত, কেউ চিনে নাই, আমিও তো চিনি নাই, আমিও দেখছি, আমিও তার ছবি তুলি নাই।

মুনেম ওয়াসিফ: সেই অর্থে বলি নাই মামুন ভাই। আমি বললাম যে, আপনার মানুষ চেনার ধরনটা বুঝতে চাই কারণ আমি দেখছি যে আপনি অনেক এরকম লোকের ছবি তুলছেন যারা এখনও বিখ্যাত হয় নাই, কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন, যে এই লোক মেধাবী এবং এই লোক হয়ত কিছু একটা হবে। এবং আপনি অনেক আগেই তার ছবি তুলছেন।

নাসির আলী মামুন: না, এইটা বোঝা যায়, যেমন আমার মনের মধ্যে একটা রাডার আছে ঐটা বুঝতে পারে যে, টোকা দিলে যেরকম কলসি বাজে না? এইটা বোঝা যায় যে, কার মধ্যে মেধা আছে। এই রকম আমি ভুল করছি শতকরা দুই জন। বহু মানুষের যেমন-রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এই লেভেলের ছবি তুলছি ওরা যখন কবি হয় নাই, বই প্রকাশ পায় নাই, সেভেন্টিজে এদের ছবি তুলছি। পরে আমি দেখছি যে, ম্যাক্সিমাম এদের বেশির ভাগই কিন্তু উৎরাইয়া গেছে। তারা সৃষ্টিশীল হইছে, দেশে নাম করছে, ভাল কাজও করছে। ৫০টা ১০০টা বইও অনেকের আছে, আমি তাদের ছবি তুলি নাই, এমন বহুলোক আছে। আমারে ফোন করে, ঘুরে ছবি তোলার জন্য এমন বহু লোক আছে। তুলি না ছবি।

 

 

ফিরিস্তি

মুনেম ওয়াসিফ ও তানজিম ওয়াহাব

…ওয়াসিফ: জিনিসটা যথেষ্ট ভাঙ্গছে। আসলে বাংলাদেশের এই ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট সোশ্যাল ডকুমেন্টরি নিয়া আমরা যতটুক ভীত, এত ভয় পাওয়ার কিছু নাই। আপনি যদি একটু গোনেন আমার কাছে মনে হয় না এদেশে সোশ্যাল ডকুমেন্টরির সাত আটটা ক্লাসিক কাজ বের হবে।

তানজিম: ক্লাসিক বলতে আপনি কি বুঝাইতেছেন?

ওয়াসিফ: ক্লাসিক বলতে, মানে কালজয়ী। ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা কিংবা সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালির মত, যুগে যুগে মানুষ যেটা মাইল স্টোন হিসাবে দেখবে।

তানজিম: আপনাকে আমি জিগাইলাম কারণ আপনার কথায় অনেকে আবার ক্লাসিক বলতে ডকুমেন্টরিতে ক্লাসিক এপ্রোচ না ভাবে। একটা অভিযোগ হইল এ জায়গায় ডকুমেন্টরিতে বেশি দেখা যায় ক্লাসিক এপ্রোচ, মানে গল্প বলার পুরানা পদ্ধতি এবং আধুনিক যুগে অনেকে ভাবে এইটা আমগো পিছায়া দিতাছে।

ওয়াসিফ: সেই একটা জায়গায় সাত আটটা স্ট্রং কাজ হইছে, হুইচ ইজ ফেয়ার এনাফ। এবং আমার কাছে মনে হয় পরের জেনারেশন এইটার মধ্যে অনেক ইন্টারেস্টিং টুইস্ট দিছে এবং অনেক জায়গা তৈরি হইছে। ধরেন সেইখানে রাসেলের মত ফটোগ্রাফার একটা আরবান ল্যান্ডস্কেপ করতেছে, কালারে একদম মেলানকোলিক একটা স্যাড কালার টোন, সেখানে ধরেন তুশিকের মত ফটোগ্রাফার তার নিজের জীবনের সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি নিয়া ছবি তুলছে।

তানজিম: কিংবা সুমনের মত ফটোগ্রাফার তার সেলফ পোর্টেট এবং নিজের মায়ের সাথে স¤পর্ক নিয়ে কাজ করছে, ব্যক্তিগত ইমোশন দিয়া…

ওয়াসিফ: হু… তার সাথে সাথে কিন্তু আমার ধারণা এই ভিন্নভাবে গল্প বলার চেষ্টা অনেক আগে থেকেই ছিল। ধরেন মুন্নি আপা বহু আগে তার ফ্যামিলি নিয়ে একটা স্টোরি করছে কিংবা সামিরা বহু দিন আগে ছবি এবং টেক্সট ওভারলেপ করে ইন্টারেস্টিং কাজ করছে। কিন্তু যেটা হইছে, ভিন্ন কাজগুলা করার যে প্রবণতা ছিল, সেটা কোন কারণে উৎরাইয়া যায় নাই, স্টাবলিস্ট হয় নাই, কোন কারণে ইন্টারন্যাশনালি লিংকড হয় নাই। কিংবা আমরা এই কাজগুলাকে পাটাতন দিতে পারি নাই। ফলে সেই কাজগুলা হারাইয়া গেছে। আবার এখন যে নতুন কাজ হইতেছে, যেটা আমাদের কাছে দেখে র‌্যাডিক্যাল মনে হইতেছে, মনে হচ্ছে যে ক্লাসিক্যাল ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফিতে এইটা টুইস্ট মারছে। ফটোগ্রাফাররা অনেক বেশি পার্সোনাল, ইন্টিমেট, কমপ্লি­কেটেট স্টোরি বলতেছে, এইটা কিন্তু একটা সময় ক্লিসে হয়ে যেতে পারে। যেইটা এখন ইনডিয়ায় হইছে। সব ফটোগ্রাফারই একটা মিডিয়াম ফর্মেটে, সেøা, বোরিং, একধরনের মিডিল ক্লাসের গল্প বলে। এবং সেই ছবিগুলা গ্যালারিতে যায় এবং গ্যালারিতে গেলে সেটা একটা এডিশনে বিক্রি হয়। এবং সেটা হিস্ট্রিক্যালি ফটোগ্রাফির নানান রকম কনটেক্সটের সাথে জড়িত বলে একটা থিউরিটিক্যাল প্যাঁচাল হয়। সো আমার কাছে মনে হয় প্রত্যেকটা সময়ই একটা নতুন গল্প বলার ধরন আসে, কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হল, যে গল্পটা আপনি বলেছেন সেই গল্পটার সাথে আপনি কানেক্টেড কি না। কিংবা আপনি ফিল করেন কি না।

তানজিম: সেই জায়গাটায় আমি বলি ‘ভিন্ন’ এবং ‘নতুন’ এই দুইটা শব্দই একধরনের ট্র্যাপ। আমরা ‘ভিন্ন’ বলতে আসলে কি বুঝাই? ‘ভিন্ন’ কি শুধুই আসলে ভিন্ন কিছু করার জন্যই? শুরুতে আমাদের কিন্তু সেরকম আর্গুমেন্ট ছিল না, আর্গুমেন্টটা ছিল একজন নতুন ফটোগ্রাফার আসলে কতগুলা জানলা খোলা পায় এবং সে কত বৃহৎ ভাবে ডকুমেন্টরিটা বুঝতে পারে। তারপর যেই জায়গাটা তাকে টানে, যে জায়গাটায় সে কানেক্টেড ফিল করে, নিজের সাথে সম্পর্ক খুঁজে পায়, যেটা সে বিশ্বাস করে, কিংবা যেটা তাকে অনেক এক্সাইটেড করে, ইন্সপাইয়ার করে, সে ঐ কাজটা নিবে। তার জন্য ইন্ডাস্ট্রিতে সেই সুযোগ আছে কি না?

ওয়াসিফ: আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয়, আমরা আসলে অনেক বেশি ফটোগ্রাফির ভিতরে আছি। এবং অনেক ধরনের ফটোগ্রাফিক স্কুল, দেখা, রাজনীতি এইগুলা নিয়া আমরা আসলে এত জর্জরিত! মাঝে মাঝে আমরা ফটোগ্রাফির যে একটা খুব সাধারণ, ইনোসেন্ট বিউটি আছে সেটার কথাও ভুলে যাই। কিন্তু ওইটাই আমার কাছে মনে হয় ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফির সবচেয়ে বড় স্ট্রেঙথ। ধরেন, মানে বাংলাদেশেই ধরেন, আমার খুব মজার লাগে ফ্যামিলি এ্যালবামে যে ছবিগুলা দেখা যায়, কিংবা ধরেন আমরা এইবার যে ছবিগুলা ছাপাচ্ছি, মানে হিন্দুরা মরা মানুষের যে ডকুমেন্ট করে, কিংবা ধরেন পুলিশ কিংবা মেডিকেলে কেস স্টাডির মত করে যে ছবিগুলা তোলা হয়, কিংবা যুদ্ধে আর্মির একজন ফটোগ্রাফার একদম ফটোগ্রাফিক এপ্রোচ বাদ দিয়ে একদম নিখাদ ডকুমেন্ট করার জন্য যে ডকুমেন্টগুলা করে… আমার কাছে মনে হয় ফটোগ্রাফির একটা ইন্টারেস্টিং জায়গা হইল ফটোগ্রাফাররা ছাড়াও এই ফটোগ্রাফি এবং ফটোগ্রাফ, দুইটা জিনিসকে নানান মানুষ নানানভাবে ব্যবহার করে। এবং এটা যদি আপনি ভাল করে দেখেন, এটার ভিতরে অনেক ভাঁজ আছে। এটার ভিতর অনেক তরিকা আছে এবং অনেক ইনোসেন্স, নাইভ, ইন্টারেস্টিং দেখার জায়গা আছে। আমাদের মাঝে মধ্যে এই জ্ঞানের গরিমা থেকে বের হয়ে একটু সহজ মনে ছবিগুলো দেখা দরকার। তাইলে হয়ত অনেকগুলা ছবি আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠবে। ইন দ্যা এন্ড অফ দ্যা ডে, আপনি আসলে কোন স্কুলে কেমনে কি ডকুমেন্ট্রি ফটোগ্রাফি করবেন এইটা ইম্পরট্যান্ট না, কাজটা যদি আসলেই ভাল হয় এবং ওটার ভিতর যদি প্রাণ থাকে, ওটা যুগের পর যুগ ধরে টিকে থাকবে।

তানজিম: হ্যাঁ। কিন্তু আরেকটা জিনিস হইল, যে ছবিটায় প্রাণ দিল, দরদ দিয়া তুলল, এই ছবিটা আমরা আসলে তুলি কার জন্য? আমরা কখনও তেমন একটা বলি না যে কারে দেখানোর জন্য ছবি তুলি। অলরেডি ইন্ডাস্ট্রির কথা বলছি, গ্যালারির কথা বলছি, পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলছি, বলছি আমি কি দেখাইতে চাই, আমি কি করে কানেক্টেট, কিন্তু এই ছবিগুলোর দর্শক কে? তারা আসলে কোন ছবিগুলা খুঁজে? কই ছবিগুলা পায়? যেমন আপনি বললেন যে অদ্ভূত কিছু ছবি আছে যেইটা ফ্যামিলির ছবি, বাংলাদেশে কিন্তু এই রকম ছবি নিয়া ইন্টারেস্টিং কিউরেশন এখনও হয় নাই। কেবল শুরু হচ্ছে ছবিগুলাকে ভাল করে দেখা, সংরক্ষণ করা, ছবিগুলাকে দেখানো। আমরা বাংলাদেশে যে ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফি করি, এইটা স্পেসিফিক্যালি এজেন্সি ওরিয়েন্টেড বা বিদেশি গ্যালারি ওরিয়েন্টেড, সাধারণ মানুষের আসলে ছবি দেখা খুব বেশি হয়ে ওঠে না বাংলাদেশে।

ওয়াসিফ: সেটা একদিক থেকে সত্যি এবং এই কথাটার অনেকগুলা ভাঁজ আছে। আমার কাছে মনে হয় ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে এইটা খুবই ইম্পরট্যান্ট। যেমন ধরেন সালগাদো যে ধরনের কাজ করে। আমরা খালি সালগাদোর সেই ছবিগুলাই দেখি যেগুলা জায়ান্ট, এপিক, ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট হিউজ স্টোরি। কিন্তু এর সাথে সাথে সালগাদোর একটা খুব ইন্টারেস্টিং এক্সিবিশন ছিল, ল্যাতিন আমেরিকার ট্রেনের ভিতরে ছবি পেস্ট করছে এবং সেই ট্রেনটা ল্যাতিন আমেরিকার বিভিন্ন শহরের মাঝখান দিয়ে গেছে এবং স্টেশনে যখন ট্রেনটা দাঁড়াইত, যাত্রীরা ঢুকত আর বের হইত এবং তারা ছবিগুলো দেখত, খুব ইন্টারেস্টিং কিন্তু। কিংবা ধরেন সুসান মাইসেলাস যখন তার তোলা নিকারাগুয়ার যুদ্ধের ছবি যুদ্ধের ২৫-৩০ বছর পর গিয়ে এক্সাক্টলি সেম লোকেশনে, যেখানে ছবিটা তুলছে, সেখানে ছবিগুলা এক্সিবিট করে এবং পাবলিকের সাথে যে ইন্টারেকশন হয় সেটাও খুব প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কিন্তু অন্য জায়গা থেকে আমার আরেকটা জিনিসও মনে হয় যে, সব ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফার যে ছবি দেখায় তা কিন্তু না। যেমন ধরেন কুদেলকা সারা জীবন অনেক কাজ করছে। কিন্তু খুব অল্প ছবি আমরা দেখতে পাইছি। যেমন ধরেন লাস্ট ১০ বছরে কুদেলকা কোন ছবি কাউকে দেখায় না। কিংবা ধরেন একজন স্ট্রিট ফটোগ্রাফার। কয়েকদিন আগে বলা হইছে রবার্ট কাপা আর তার বউ এর মেক্সিকার একটা সুটকেস আবিষ্কার হইছে, সেইখানে তাদের মেক্সিকো ট্রিপের হাজার হাজার নেগেটিভ ছবি। তো আমার কাছে মনে হয়, এখনকার ফটোগ্রাফির চল অন্যরকম। ডিজিটাল ক্যামেরা আসছে, আপনি একটা এজেন্সির সাথে রিলেটেড, সো ছবি তোলেন আর সাথে সাথে ডাউনলোড করেন। কি ওয়ার্ডটা ফিল ইন করেন, প্লাগ কানেক্টেড করেন, ছবি নিউইয়র্ক টাইমস-এ চলে যায়। নিউইয়র্ক টাইমস এর ব্লগে আপনার ছবি দেখা যায়, সেই ছবি আপনি আবার ফেইসবুকে পোস্ট করেন। সেখানে একশটা লাইক পরে এন্ড ইউ আর ইন এ কম্পিটিটিভ, সুপার স্পিড ফ্রেম ওয়ার্ক। সবসময় কিন্তু জীবনটা এই রকম হওয়ার কথা না, কিংবা সবসময় তাড়াহুড়া করে ছবি তোলারও দরকার নাই। আপনার কিন্তু দম নেবার সময় আছে এবং স্থির হবার সময় আছে। ধরেন ফটোগ্রাফিতো অনেক সময় জীবনানন্দ দাশের কবিতার মত করেও হতে পারে। আপনি আপনার নিজের খাতায় লিখবেন এবং সেটা রাখবেন। দীর্ঘ দিনে ছবিটার সাথে কিংবা কবিতার সাথে সাথে বড় হবেন এবং একটা পর্যায়ে গিয়ে হয়ত প্রকাশ করবেন।

নিঃসঙ্গ প্রকৃতির রূপকার

ডঃ নওয়াজেশ আহমেদ

আলাপচারিতা: নাসির আলী মামুন

 

নওয়াজেশ আহমেদ: তখন আমার সঙ্গে ছিলেন বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। উনিও একজন মেম্বার ছিলেন। আমাকে বলছিলো, আপনি কলকাতায় যান। কলকাতায় গিয়ে আরো কিছু ছবি বেছে নিয়ে এসে এটা করেন। আমি একটা অজুহাত দেখালাম যে কলকাতা যেতে পারবো না। না গিয়ে বুদ্ধি করে এখানে দু’’টো পার্ট করলাম। একটা স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের ওপর, বাকিটা রূপসী বাংলা, ‘হে বাংলা আমার। কার জন্য যুদ্ধ?’ এই বাংলার জন্যই তো, যে জন্য আমাকে প্রচুর বিরোধিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিলো। কেউ ছবি দিতে চাচ্ছিলো না।  অ্যানি ওয়ে, আমি বলবো যে  আমাদের ওই এক্সিবিশনটা খুবই সাকসেসফুল, সত্যিকারের উন্নতমানের একটা জাতীয় প্রদর্শনী হয়েছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচুর ছবি ছিলো, আরেকদিকে গ্রাম বাংলার ছবি। আমরা বলেছিলাম যে যদি এই পোরশনটা না দেখাই, তবে আমাদের আলোকচিত্র স্থান পাবে না। বঙ্গবন্ধু আসলেন, দেখলেন, খুবই খুশী হলেন এবং বললেন যে, ‘তোরা আর কি কি করতেছস?’ যেহেতু আর্ট কলেজের মধ্যে হচ্ছিলো, ওখানে আর্ট কলেজের প্রিন্সিপালও ছিলেন। তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন জয়নুল আবেদীন। তাকে আমি বললাম, তিনি বললেন যে, ‘হ্যাঁ, এটা তো ভালো কথা। এটা তো আমাদের অনেক আগেকার আইডিয়া ছিলো’। বললেন, ‘নায়েবউদ্দীনকে ডাক দেন। কারণ তার কতগুলি প্রিয় লোক ছিলো। আমানুল হককে একটু ডাকেন’।

আমি এদেরকে ডেকেছিলাম। আমানুল হক সাহেব অসুস্থ থাকায় আসেননি। নায়েবউদ্দীন সাহেব, আমি, কিছু প্রেস ফটোগ্রাফার ছিলাম। সব মিলে বলা হলো আবেদীন সাহেবকে, ‘আপনি যেটা করতে পারেন’। আমাকে বললো, যেহেতু আমি বহু দেশ ঘুরে এসব আর্ট ইন্সটিটিউট দেখেছি। আমাকে বললেন, ‘আপনি কোন জায়গায় কি দেখেছেন বলেন’। আমি বললাম, স্পেশালাইজড হয় দুই বছর। সিনেমাটোগ্রাফি এখন না, কারণ এটা একটু হেভি। কিন্তু স্টিল ফটোগ্রাফি করা যেতে পারে। উনি রাজি হলেন। তারপর ’৭৫ এসে গেলো। গন্ডগোল হলো। আমিও দেশ ছেড়ে কাজে গেলাম। পরবর্তীতে জিনিসটা ভাটার মধ্যে চলে গেলো। কিন্তু আলোকচিত্রীদের মধ্যে একটা দল বললো যে, তারা আর্ট কলেজের সঙ্গে না রেখে নিজস্ব একটা ইন্সটিটিউট করবে। আমার মনে হয় সেটা একটা ফ্যাক্টর।

নাসির আলী মামুন: এই দলে কারা ছিল?

নওয়াজেশ আহমেদ: আমি ঠিক জানি না। আমি তখন দেশের বাইরে। শুনলাম। আর্ট কলেজের কাইয়ুম চৌধুরী, যারা গ্রাফিক্স নিয়ে কাজ করে তারা খুব ইন্টেরেস্টেড ছিলো। তারা আমাকে বললো যে ফটোগ্রাফাররা তো অন্য কথা বলে…..

ফটোগ্রাফি উইদাউট ক্যামেরা!

বিজন সরকার

আলাপচারিতা: মুনেম ওয়াসিফ

মুনেম ওয়াসিফ: তো, আপনার একভাই তো সাইনবোর্ড ব্যানার এসব আঁকতেন, আরেক ভাই কী করতেন?

বিজন সরকার: সে-ও এই কাজই করতেন। যেহেতু তাঁরা তিন বছরের বড়-ছোট ছিলো, তো ন্যাচারালি ফ্রেন্ডসও হয়েছে সেরকম । আর আমি বড় ভাইয়ের তের বছরের ছোট। বিরাট একটা গ্যাপ রয়েছে। গ্যাপের জন্যই বোধহয় আমার ভাইয়ের প্রতি আলাদা একটা ভালোবাসা ছিলো, আবার বিস্ময়করও ছিলো যে উনি বহু কাজ করতেন। বহু কাজ করতো বলতে এইটা মনে হয় প্রতিভাবানদের ব্যাপারে কথাটা হল জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ পর্যন্ত একটা কথা আছে মানে যা পায় তাই করে এরকম আর কি! সে একসময় কম্পাউন্ডারিও করসে।

মুনেম ওয়াসিফ: তো, সে এরকম নানান কাজে পারদর্শী ছিলো?

বিজন সরকার: নানান কাজে। মানে, আমি যতদূর জানি আর কি! দোকানের হিসাব রাখার কাজ করত, আবার কম্পাউন্ডারিও করতো। বিভিন্ন লেখালেখি এইসবের মধ্যে ছিলো। সে ছবি আঁকাতে যখন আরেকটু বেশি দিন কাটালো, অনেক কিছু করলো, তখন সে মূর্তি বানানো শুরু করলো। প্রতিমা-স্বরস্বতী, লক্ষ্মী এগুলো। স্বরস্বতী পূজা তো আমাদের ব্যাপকভাবে প্রচলন আছে। তো মূর্তি বানানোর ক্ষেত্রেও অনেকরকম জ্ঞান দরকার। আমি ছোটবেলায় দেখেছি, যে মাটিটা ছানতো, ঐ মাটির ভেতরে আগে পাট কেটে দিতো, পরে আবার ধানের তুষ মেশাচ্ছে। আমি বলি ‘এগুলা দিলে কেন?’ ও বলে ‘এইটা আরো ছোট অংশে মাটি ধরে রাখে’, এইরকম আরো কি সব বললো যেটা মনে নাই। উনার এক আর্টিস্ট ফ্রেন্ড ছিলো কলকাতায়। উনাদের যে কাজ-কাম বা বিচরণ সবই কলকাতা ভিত্তিক আর কি। সেই কারণে পাকিস্তান যখন আলাদা  হলো তখন উনি আসামে ছিলেন। উনি এই ধরনের নানান সৃজনশীল কাজের মধ্যেই ব্যাপ্ত ছিলেন… যেহেতু ভাইয়ের অনুপ্রেরণা আমি পেয়েছি, তাই কিছুটা বলতেই হবে। উনি বোধহয় ফোরটি ফাইভ এর দিকে, কিংবা ফোরটি ফোর এর দিকে হতে পারে, মিনিট ক্যামেরা ব্যবহার করতেন। পেপার নেগেটিভ।

মুনেম ওয়াসিফ: কিন্তু আপনি প্রথম ক্যামেরা হাতে পাইলেন কবে বা শুরু করলেন কবে?

বিজন সরকার: এই অনুপ্রেরণাটার প্রয়োজন আছে, সেইজন্যই বলি। এর মাঝখানের পিরিয়ডে, বড় ভাই কথা-বার্তা বলতো ছোটভাইয়ের সাথে। আমার সঙ্গে না, আমি তো তখন কথা বলার অযোগ্য। দশ বছরের ডিফারেন্স, আমার সঙ্গে কী কথা বলবে? মেঝ ভাইকে বলতো, লাইটিং সম্বন্ধে। তারপর একটা ভেরি ইম্পোর্ট্যান্ট কথা বলেছে। নাচে বা গানে পুরস্কার পেয়েছে, এটা নিয়ে বলছেন যে কোন বিচারক বিচার করেছে, সে কি বোঝে এই কাজ? কিংবা এরাই বা কার কাছে দেয় বিচার করার জন্য? কোনো শিল্প কোনোদিন বিচার করার অধিকার কারো নাই। ওই কথাগুলো বলছে। শিল্প তো হচ্ছে সাধনার বিষয়, এটা সারাজীবন শুধু সাধনা করে যেতে হয়। এর মাধ্যমেই যাবতীয় উত্তরণ হয়। কী অদ্ভুত কথা না?

মুনেম ওয়াসিফ: অনেক মূল্যবান কথা।

বিজন সরকার: অনেক মূল্যবান কথা না? এটা ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা। ভাই তো আমাকে পাত্তাই দেবে না, এই কথা শোনাবে? ‘এই ভাগ, ডিস্টার্ব করিস না’, এই কথা বলতো আর কি! কিন্তু এই কথা ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি। তারপর লাইটিং সম্বন্ধে বলত, কোথায় কোন লাইটিং। ধরেন, এখানে বসলে ডান দিকের যে লাইটিংটা আসবে, এই লাইটেই এইদিকে মুখটা ঘোরালে পরে দুই মুখেই আসবে। এদিকটা শেড, এইদিকটায়। এইসব কথা আমি তখনই বুঝতে পারতাম। তারপরে খোলা জায়গায় বারান্দায় একটা ঘর আছে, তার চাল নেই। তার সামনে যদি দুই-তিন হাত উপরে দিয়ে একটা কালো কাপড় মাথার ওপর দিয়ে দেয়া হয়, তাহলে পাসপোর্ট ছবি খুব ভালো আসবে। লাইট দুই দিকে যদি সমান থাকে তাহলে একরকম লাইট হবে, একদিক যদি বেশী থাকে থাকে তাইলে হালকা লাইট অ্যান্ড শেড হবে। চমৎকার কথা না? এইগুলা তো আমি জ্ঞান হওয়ার আগেই শিখেছি। বড় ভাই বলতো এইগুলো।

মুনেম ওয়াসিফ: তখন আপনার বয়স কত হবে? ৭-৮-১০ বছর? স্কুল-টিস্কুলে পড়েন তখন?

বিজন সরকার: বয়স হবে… পাকিস্তান যখন হয়, ৪৭-এ, তখন আমি ১২ বছর। হিসাবটা আসলে…

মুনেম ওয়াসিফ: আচ্ছা বয়স গুরুত্বপূর্ণ না, আপনি গল্পটা বলতে থাকেন, যে কথাগুলো শুনছেন সেই সময়।

বিজন সরকার: এই জিনিসগুলা আমি পরে বুঝলাম যে আমার যে অনেক ক্রিয়েটিভ জ্ঞান আসছে, এইটা নিশ্চয়ই আমার ভাইয়ের কারণে। এইরকম আরো অনেক কথা আমি আমার ভাইয়ের কাছে শুনেছি। সব মনেও নাই। কিন্তু ভাইয়ের কারণে আমার এই ক্রিয়েটিভ জ্ঞানটা হইসে। আমি এখন মনে করি অই যে আপনি আমার ওই ছবির ইন্টারভিউ নিতে চেয়েছেন, ঐটা আমি আর দিতে চাই না। চাই না এইজন্যে, যে কাজ আমি ষাটের দশকে করেছি, সেই কাজ আজও বাংলাদেশের কোনো ফটোগ্রাফার জানে না। ঔৎসুক্যও কেউ প্রকাশ করে নি। তাইলে আমি কি মনে করবো?…

ফিরিস্তি

মুনেম ওয়াসিফ ও তানজিম ওয়াহাব

 

তানজিম: এবং ট্যাবুর কিন্তু শেষ নাই যেমন কালার ফটোগ্রাফির কথা চিন্তা করেন,ছবিতে যদি কালার উজ্জ্বল না থাকে,অনুজ্জ্বল কালার হইলে সেটা কালার ছবি হইলো না। এই ধরনের ট্যাবুও কি আপনার মনে হয় না এখনো…

ওয়াসিফ: আমার কাছে মনে হয় যে এইটা আসলে খুব হাস্যকর, আমার কাছে মনে হয় মূলত এমেচার  ফটোগ্রাফারদের এই ট্রেন্ডটা বেশী থাকে। ঐ যারা একটু ক্লাব ফটোগ্রাফি করে তারা মনে করে নীল আকাশকে গাঁঢ় নীল,সবুজ ঘাসকে হলুদ ঘাস বানাইয়া দিলাম। তাইলেই হয়তো ছবিটা ইন্টারেস্টিং হইয়া গেল। কিংবা ছবিটা একটু ঘোলা ঘোলা হইলেই মনে হয় আর্ট হইয়া যায়। বাংলাদেশের আসলে ফটোগ্রাফি কি আদৌ আর্ট কি না,এ নিয়েই তো আমাদের এখনও যুদ্ধ চলতেছে,ধরেন আমাদের ঘরের ভিতরেই এখনো ফটোগ্রাফি আসলে সেই অর্থে আর্ট হিসেবে স্বীকৃত না।

তানজিম: আমিতো বলবো হ-জ-ব-র-ল অবস্থা,তবে আমি শুধু ফর্ম দিয়ে এটাকে দেখি না,আমার কাছে মনে হয় এইখানে কন্টেন্টটাও এক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরেন আর্ট ফটোগ্রাফির যারা চর্চা করে বা আমরাই নিজেরাইতো চর্চা করি,সেখানে আর্ট ফটোগ্রাফির মানেই যেনও সুন্দর ছবি অথচ একটা সামাজিক কোন সমস্যা বিষয়ক ছবি তুললে সেটা যেনও আর্ট ফটোগ্রাফি না, সেটা যেন একটা সাংবাদিকের চোখ দিয়ে দেখা কিংবা সেটা একধরনের  ভিন্ন সোশ্যাল ডকুমেন্টারির ছকেই ফেলে দেয়া। কোনো স্ট্রাগল বা সংগ্রাম বা কোনো কিছুর মধ্যে বিমর্ষতা যেন আর্ট ফটোগ্রাফি হইতে পারে না।

ওয়াসিফ: আমাদের এইখানে এখনও আর্ট ফটোগ্রাফি মানে হচ্ছে যে কোনো জিনিসের সুন্দর দেখানো, মানে-একধরনের ঐ সুগার কোটেট ছবি তোলা আর সোশ্যাল ডকুমেন্টারি মানে হচ্ছে গরিবের দুঃখ,কষ্ট,ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট,হার্ড কন্ট্রাস্ট-এ ছবি তোলা। আমার কাছে মনে হয় দুইটাই স্টেরিও টাইপ এবং দুইটাই ক্লিশে