সোশাল রিয়ালিটির বাস্তবতা অভিযান

কলোনিয়াল পোর্ট্রেট থেকে ডেভেলপমেন্ট ডিসকোর্স

নাঈম মোহায়মেন

…পূর্ব বাংলার ফটোগ্রাফিতে বাস্তবতার আগমনের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গেলে পেইন্টারদের প্রসঙ্গটা চলে আসে, বিশেষ করে জয়নুল এবং পরবর্তীতে কামরুলের ভূমিকা। এখানে কলোনিয়াল আমলের ফটোগ্রাফারদের লিগাসি নিয়ে বিড়ম্বনাটা আরেকটু তীক্ষ্ণ হয়। দেশ-বিভাগের আগে যে ফটোগ্রাফির ধারা চালু ছিল তা যথেষ্ট ভাবে এই বাংলার ফটোগ্রাফিকে রিয়ালিজমের দিকে টেনে নিতে পারেনি (যদিও কিছু ফটোগ্রাফি স্টুডিও স্থাপন হয়েছিল)। এবং এই শূন্যতার কারণেই জয়নুলের কাজের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জয়নুলের ভূমিকার কথা বলতে গেলে মন্বন্তরের কাজটি (‘ফ্যামিন সিরিজ’) ভালমতো বুঝতে হবে, এবং বিশেষত সেই সময়কার প্রচলিত চারুকলায় এর প্রভাবটাকে খতিয়ে দেখতে হবে। সেই সময়ের প্রচলিত ধারার ব্যাপারে শোভন সোম লিখেছেন:
‘অ্যাকাডেমিক কেতার পুরোধা শিল্পীদের ছবিতে বিষয় হিসাবে প্রাধান্য পেত নগ্নিœকা, অভিজাত বা ধনবান মানুষের অজুরায় আঁকা প্রতিকৃতি এবং অজুরায় আঁকা নানা বিষয়ের ছবি। বলা বাহুল্য, যেহেতু ছবি আঁকাই তাঁদের জীবিকার উপায় ছিল এবং সে সময় মুষ্টিমেয় ক্রেতাদের মধ্যে ছিলেন দেশীয় রাজন্যবর্গ, জমিদার, উচ্চপদস্থ রাজপুরুষ বা বণিক এবং এই ক্রেতাদের রুচি-মাফিক না আঁকলে জীবিকার সুরাহা সম্ভব ছিল না, এ কারণে এই শিল্পীদের পক্ষেও নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে পা ফেলা কঠিন ছিল। ঐ সব বিষয় ছাড়াও এঁরা এক ধরনের দৃশ্য-চিত্র আঁকতেন যা ছিল রোম্যান্টিক আবেগে আপ্লুত, যেমন ঘনায়মান সন্ধ্যায় প্রান্তরে নামাজি, বনান্তরালে পল্লীবধূ, গোচারণ শেষে গো-পালসহ রাখাল-বালক ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, বাস্তবতা-বর্জিত এই সব রোম্যান্টিক ছবির লক্ষ্য ছিল এক বিশেষ ধরনের ক্রেতা।’৪

এই প্রেক্ষিতটা লক্ষ করলে বোঝা যায় যে, সেই সময়কার শিল্পীরা বাইরের পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবকে নিজেদের কাজে জায়গা দিত না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে, কলকাতায় বিদেশি সৈন্যের আনাগোনা, গ্রামে- গ্রামে ক্ষুধার্ত মানুষ না খেয়ে মরছে। অথচ এই পরিস্থিতিতে যামিনী রায় আঁকছে যিশু ও কৃষ্ণলীলার ছবি, যার খদ্দের কলকাতার উচ্চবিত্ত মানুষ অথবা আগন্তুক মার্কিন ও ইংরেজ সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসার। একই সময়ে ক্যালকাটা গ্র“প বিশ্ব রাজনীতির ব্যাপারে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ না নিয়ে বরং দলীয় কর্মী-শিল্পী চিত্তপ্রসাদ, সূর্য রায়, রথীন মৈত্র ও সোমনাথ হোরকে পোস্টার আঁকার কাজে আটকে রেখেছেন। এমনকি নীরদ মজুমদারকে কৃষক সম্মেলনের মঞ্চ তৈরির কাজে ব্যস্ত রাখা হয়।
এই নির্লিপ্ত শিল্প পরিস্থিতিতে জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ছবি কলকাতার ভদ্রলোক সমাজে একটা হাতবোমার মত বিস্ফোরিত হয়। শোভন সোমের ভাষায়ঃ
‘জয়নুলের ছবিতেও আমরা প্রতিবাদ দেখি না; যে সমাজব্যবস্থা এই দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছে, তার বিরুদ্ধে একটাও উত্তোলিত তর্জনী নেই। তার বিপ্রতীপে আছে নীরবে নিয়তিকে মেনে নেওয়া, আছে প্রতিবাদ-হীন মৃত্যু, কিন্তু প্রশ্ন নেই। তাঁর ছবির সামনে দাঁড়ালে দর্শক ভাবতে বাধ্য হন, কেন বিনা প্রশ্নে পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ এই পরিণাম মেনে নিল। আমরা দর্শক হিসাবে ভাবতে বাধ্য হই, যুগ যুগ ধরে এই দেশ কেন এইভাবে ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে। আর তখনই আমরা তাঁর ছবিতে নিজেদের স্বরূপ দেখে অনুভব করি যে, এই সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। তাঁর ছবিতে যা প্রতিবাদ-হীনতা বলে প্রতিভাত হয় বস্তুত তা প্রতিবাদকেই উসকে দেয়।’৫
জয়নুলের দুর্ভিক্ষ সিরিজের রূঢ়, মোটা, উগ্র, ড্রাই ব্রাশ স্ট্রোকগুলো নতুন এক ভাষার ইঙ্গিত দেয়। আলোচকরা বলেন যে, এই কাজের মধ্যে উঁচিয়ে ধরা মুঠিটা নেই। কিন্তু রাগ আছে প্রচুর। ভিক্ষুক, কুকুর, কাক এক জায়গায় মিলে গেছে ছবিগুলোতে। তাদের খাদ্য সন্ধানের স্থান এবং মৃত্যুর জায়গা মিলেমিশে আছে। হয়ত এক প্রজাতি মরলে সে অন্যের খাবারে পরিণত হবে। কলকাতার শিল্প-মহল জয়নুলের কাজ দেখে হতবাক হয় শুধু সোশাল রিয়ালিজমের থাপ্পড়ের জন্য নয়। তার সাথে যুক্ত হয় এই চিন্তাঃ ‘এ কোথা থেকে এলো, আমাদের প্রভাবের চিহ্ন পাচ্ছি না কেন?’ অনেকে তাকে বাক্সবন্দি করার জন্য ‘সোশাল রিয়ালিস্ট মুসলিম’ বলে আখ্যায়িত করে।
জয়নুলের সেই বড় ভাঙনের পর ফিরে যাবার পথ আর থাকে না। তার অনুগত কামরুল হাসান ও সফিউদ্দিনের কাজের সমন্বয়ে পেইন্টিংয়ের রোমান্টিক অতীতের সাথে একটা ভাঙন হয়ে যায়। ভারত বিভাগের পরে জয়নুলের প্রভাবে রিয়ালিজম পূর্ব পাকিস্তানের পেইন্টিংয়ে ঢুকে যায়। আমার ধারণা, এই জয়নুল স্কুল থেকেই রিয়ালিজমের ধারাটা ফটোগ্রাফির মধ্যে চলে আসে (বা, অনেকগুলো প্রভাবের একটা)। যেহেতু পূর্ববঙ্গের আলোকচিত্রে কলোনিয়াল বেঙ্গল ধারাটা দেশবিভাগের কারণে হারিয়ে যায়, ৫০ ও ৬০ দশকের ফটোগ্রাফি সেই কলোনিয়াল ধারাকে উপেক্ষা করে বরং চারুকলার জয়নুল ও অন্যান্যের প্রভাব গ্রহণ করে। পরের দশকের ফটোগ্রাফিতে বাস্তবতার উপস্থাপন জয়নুলের সেই ‘ফ্যামিন’ সিরিজের পরবর্তী ধাপ হিশাবে ভাবা যায়। যাত্রাপথে কোন এক সময়ে জয়নুলের এগ টেম্পেরা হয়ে যায় নাইব উদ্দিনের নেগেটিভ।

 

আদম সুরত: নমুনা ও নারায়ণ দাজি

মুসতাইন জহির

…হারাধন দে-র পূর্বসূরি, স্বজাতির মধ্যে ডাক্তার নারায়ণ দাজি (১৮২৮-১৮৭৫) যখন ক্যামেরা হাতে বের হন, তখন তিনিও এক প্রকার কর্তব্য কাজেই শরিক হন। তবে সে কর্তব্য তৎকালীন ব্রিটিশ রাজের তরে খেটেছে অনেকটা! বিজাতির মধ্যে ইউলিয়ম জনসন আর বেনিয়ামিন সিম্পসনও এইকাজে ভূ-ভারতের ‘আদম’ সুরতের নমুনা সংগ্রহে নামেন সেই সময়। নমুনা সংগ্রহের এই প্রকল্প-কলোনির জ্ঞান ও বিজ্ঞান প্রযোজনা, প্রশাসন পরিচালনা এবং পরিসংখ্যান সাজানোর বর্ণবাদী ভাবধারার উদ্দেশ্য ও বিধেয়’র অন্তর্ভুক্ত। কলোনির লগে এথনোগ্রাফি চর্চার কায়কারবারে ফটোগ্রাফি কি যোগান দিতে আসে, সেই আলাপে যাওনের আগে নারায়ণ দাজির দলভুক্ত হওনের বিষয়টা একটু বইলা নেয়া যাইতে পারে। দাজি বম্বে মেডিকেল কলেজ থন পাশ কইরা বাইর হন ১৮৫২ সনে, তখনও ফটোগ্রাফি জিনিসটা হাঁটি হাঁটি পা পা, উদ্ভাবিত হইছে মাত্র তের বছর। এরই ভিতরে ১৮৫৪ সনে বম্বে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি আর তার দুই বছর পরে কলকাতা এবং মাদ্রাজে অর্থাৎ ১৮৫৬ সনে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি খাড়ায়া যায়। দাজি এলফিনস্টোন কলেজে ফটোগ্রাফিতে মাস্টারির সুযোগটা অল্পের জন্য হাত ছাড়া করেন। বম্বে ফটোগ্রাফিক সোসাইটির কাউন্সিল মেম্বার থাকেন, ১৮৫৭-৬১ পর্যন্ত। ভারতীয় আদম সন্তান (পিপল অব ইন্ডিয়া, ১৮৬৮-৭৫) নামে আট খণ্ডে যে বই বাইর হয় তার প্রথম খণ্ডে তার কাজ ছাপা হয়।

ভারতের ইতিহাসে ১৮৫৭ ইসায়ী’র সিপাহি বিদ্রোহ বা প্রথম ‘জাতীয় যুদ্ধ’ খ্যাত ইংরাজ বিরোধী সশস্ত্র পন্থা সরকার সামলে নিলে পরে, পুরাতন কায়দায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ক্ষমতা রাইখা উপনিবেশের এই ভাগটা শাসন-কর্তৃত্বে আর ধইরা রাখন যাইব না, সেই বিষয়ে রানীর সরকার নিশ্চিত হয়। শাসন-তান্ত্রিক কাঠামো আর প্রশাসনিক বিন্যাসে হাত লাগানোর ব্যাপারে তারা মনস্থ করে। এই ভাবনার প্রায়োগিক বন্দোবস্তে, বড় একটা দিক এন্তেজাম দিতে দরকার পড়ে সেনসাস বা আদমশুমারির। মাথা গোনার পাশাপাশি, কার মাথা কিভাবে কোন বর্গে ভাগ করবেন, বাটোয়ারায় কার লগে কারে মিলায়া কি পরিচয় দিবেন, কার মুখ কোনদিকে ঘুরাইবেন, সেই কাজে আরও জোরদার ভাবে বিশাল ভারতের কোনা-কাঞ্চি পর্যন্ত আদম সন্তানদের সম্প্রদায় গত আচার অভ্যাস, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ধার্য করণের কর্মযজ্ঞে ডাক পড়ে ফটোগ্রাফারদের। কারণ, উদ্ভাবনের পর থেইকা এই বিশ্বাসের জয়জয়কার হইতে থাকে যে, ক্যামেরাই একমাত্র জাদুযন্ত্র যা অবিকল, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশেষত্ব সহ প্রতিটা বিষয়ের আগাপাছতলা হুবহু গ্রেফতার করতে সক্ষম। বিবরণ এতই নিখাদ, নির্ভরযোগ্য ও চোখের অধিক বাস্তবতার (আটার ট্রুথ) তালাশ দিতে পারে, যাতে যাবতীয় সংশয় অমূলক হইয়া যায়। ফটোগ্রাফারের নিজের ইচ্ছা নিরপেক্ষ নিশ্চিত, নৈর্ব্যক্তিক রেকর্ড পাওয়া যায়। ক্যামেরা ফটোগ্রাফারের চোখ দিয়া দেখেনা, মানে ফটোগ্রাফার যা দেখেনা ক্যামেরার কাচ তাও দেখে এবং চোখ যা বাদ দিতে চায় ক্যামেরা তারেও টাইনা আনে। এই ক্ষমতা, মানুষের ইচ্ছার বাইরে গিয়া বাইরের দুনিয়া ধারণ করবার যে কেরামতি তারে মারগারেট ইভারসেন নাম দিছেন ক্যামেরার ‘জন্মান্ধ চোখ’। যে জানেনা সেন্সর কেমনে করতে হয়। এর লগে গলা মিলায়া, এলিজাবেথ এডওয়ার্ড আরও দুরন্ত সম্ভাবনা সাব্যস্ত করছেন, তার ভাষায় ‘ইতিহাসের কাচা রসদ’ কুড়ায়া আনতে ক্যামেরার বিকল্প হয় না।

এই আশ্বাস এত উচ্ছ্বাস ছড়ায়, দৃষ্টিভেদ কইরা গহীনের গোপন ‘সত্য’ আবিষ্কারের মোহ বাড়ায়া তোলে, চর্ম চক্ষে এতদিনকার অদেখাকে জয় কইরা আনার রোমাঞ্চে অনেকেই ক্যামেরার দিকে হাত বাড়াইতে শুরু করে। দ্য ক্যালকাটা কুরিয়ার ১৮৪০ এর ৫ই মার্চ ভারতের প্রথম দাগুয়েখ টাইপের বিস্ময় নিয়া একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এশিয়াটিক সোসাইটির একটা সভায় এসপ্ল্যানেড এবং কলকাতার আরও কিছু এলাকার কয়েকটা ফটোগ্রাফ দেইখা তো লোকের চক্ষু ছানাবড়া! পরের দিন দি ইংলিশম্যান এন্ড মিলিটারি ক্রনিকল-এর প্রতিবেদনে তো উচ্ছ্বাস যেন আর ধরে না। উল্লেখ করে যে, চৌরঙির একটা ঘর থেইকা তোলা কয়েকটা ছবি খালি চোখে তো নজর কাড়েই, সাথে মাইক্রোস্কোপ দিয়া দেখলে টের পাওন যায় ছবিগুলাতে এমন কিছুর ছাপ ধরা পড়ছে যা এমনি সাধারণ চোখে কোনভাবেই উদ্ধার করা সম্ভব হইত না। বম্বের ফটোগ্রাফিক সোসাইটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (১৮৫৪, ৩ই অক্টোবর) সভাপতির ভাষণে ক্যাপ্টেন হ্যারি বার বলেন, ‘বলার অপেক্ষা রাখেনা… ইন্ডিয়া ফটোগ্রাফারদের জন্য একটা বিশাল ক্ষেত্র মেইলা ধরছে… আমাদের এমন এক শিল্প চর্চায় উদ্দীপ্ত হওন উচিত যা শিব এবং সুন্দর ছাপায়া সত্যের জয়গান হইবে’। সত্য-বস্তুর সন্ধানে এই সংঘের যাত্রাকালে তের সদস্যের মাঝে তিনজন ভারতীয়ও নাম লেখান। যার মধ্যে একজন ডাক্তার বাহু দাজি, ইনি আমাদের আলোচ্য নারায়ণ দাজির বড় দাদা।

যাত্রার পরের বছর, ১৮৫৫ সংঘের একটা সাধারণ সভায়, নারায়ণ দাজির বেশ কয়েকটা আলোকচিত্র হাজেরানে মজলিশের সামনে প্রদর্শিত হয়। তারা বেশ মুগ্ধ হন, দাজির কাজের প্রশংসা করেন। পরে সংঘের জার্নাল উল্লেখ করে বলে যে, ‘এতে বুঝা যায় দেশীয়দের হাতও বেশ পাকাপোক্ত হইছে এবং নতুন এই শিল্পের চর্চায় বেশ উন্নতি সাধন করছে’। এতে বারটার মত ছবি ছিল। তুলনায় বলা যায়, দাজি ইউলিয়ম জনসন বা বেঞ্জামিন সিম্পসনদের চে’ দক্ষতা প্রদর্শনে কোন অংশে কম যান নাই। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল ঘুইরা এগুলা তোলা। এখানে তরুণ নারায়ণ দাজির আধুনিক চোখে ভারতের প্রায় নিশ্চল গ্রাম, অনড় রীতিনীতি আর বিস্তীর্ণ প্রকৃতির মাঝে মানুষের উপস্থিতি পেশা ও বৃত্তির অনুষঙ্গ হইয়া উঠছে। মানুষগুলাকে তার পেশা, পোশাক, সরঞ্জাম ও শরীরের গড়ন থেকে আলাদা কইরা ঠাহর করা প্রায় কষ্টকর ঠেকে। এরা যেন বিভিন্ন অংশে, উপকরণের উপাত্ত হিশাবে অনেক যতœ সহকারে, মেপে মেপে, বাহুল্য ছাড়িয়ে পরিচ্ছন্ন প্রামাণ্য সংগ্রহে সতর্ক আয়োজনে কেটে আনা অংশবিশেষ। তাদের বসার ভঙ্গি কিম্বা দাঁড়ানো, হাত ও পায়ের অবস্থান এমনভাবে সাজানো, হাতিয়ারগুলা এমনভাবে গুঁজে দেয়া, মনে হইতে পারে বুঝি এগুলা ধইরা থাকার জন্যই তাদের ডাক পড়ছে। তারা বেশ শক্ত, ভাবলেশহীন-ভাবে নিজের শরীর যথাসম্ভব যন্ত্রানুসঙ্গের অনুকূলে জড়সড় কইরা রাখছে। হাত পা একটু নড়াচড়া করলে বা শরীর এদিক সেদিক একটু হেলে পড়লে হাতে ধরা বস্তুগুলার জ্যামিতিক ফর্ম, শৃঙ্খলা হুড়মুড় ভাইঙ্গা পড়তে পারে, সেই ভয় যেন তাগোরে তাড়া করতেছে।

 

ডকুমেন্টরিঃ প্রামানিকতা ও বিবিধার্থ

অলিভার লুগন
অনুবাদ
ওয়াহিদ সুজন ও সম্পাদনা পর্ষদ

আমরা যদি আজও ডকুমেন্টারির মত একটা নিত্য পরিবর্তনশীল ধারণার অর্থ ভালভাবে বুঝতে চাই, দুর্ভাগ্যের বিষয় তাতে পিছনে ফিরার প্রয়োজন পড়ে খুব সামান্যই। সময়ান্তরে ডকুমেন্টরি কথাটার অর্থ নানান রূপ এবং ভঙ্গি অদল বদলের মধ্যে দিয়ে গেছে। ফলত, পরস্পর বিরোধী সংজ্ঞাও পয়দা হয়েছে। ডকুমেন্টরি ধারণাটির অসঙ্গতি এর নিজস্ব ইতিহাসের কোন শেকড়ে জড়িয়ে আছেÑ অতীতে পুনর্দৃষ্টি কেবল তার হদিসটুকু উন্মোচিত করবে। ডকুমেন্টরি অভিধাটি আদতে কি অর্থ ব্যক্ত করে সে বিষয়ে আজও কেউ নিশ্চয় জ্ঞান হাসেল করতে পারে নাই ফিল্মের কথা টানলে, আপাত একটা সংজ্ঞা পয়দা করা সম্ভবÑ মোটা দাগে যা কিছু ফিকশন নয় তাই ডকুমেন্টরি। কিন্তু ফটোগ্রাফিতে ডকুমেন্টরির বিপরীতে এমনতর কিছু দেখানো কঠিন, কেননা ফটোগ্রাফির মধ্যে কোন জিনিসকে আমরা ফিকশন বলে আলাদা করে দেখাব? কাজেই ডকুমেন্টরি অভিধাটির প্রকৃত পরিসর নির্ধারণের মুশকিলটাও এখানেই নিহিত। সে যাইহোক, অর্থবোধকটার এই অস্পষ্টতা চলার পথে বিশেষ বাধা হয়ে দাঁড়ায় নাই; বরং এর সাফল্য এবং ছড়িয়ে পড়ায় সহায়ক বনেছে, জগত জুড়ে নানান কিসিমের নির্মাতারা নিজের কাজটাকে এই তকমায় মুড়িয়ে চালিয়ে দিয়েছে, মানুষের কাছে ফেরি করেছে। গত প্রায় এক শতক জুড়ে ডকুমেন্টরির প্রভাব-প্রতিপত্তির বড় কারণ রয়েছে অভিধাটি দেদারসে ব্যবহারের এই অবাধ স্বাধীনতায়।

অবশ্য, অজস্র সংজ্ঞার এতসব অস্পষ্টতার মাঝেও এমন একটা উপাদানের সাধারণ উপস্থিতি ও ঐক্যসূত্র পাওয়া যাবে যা কোনকিছুকে ডকুমেন্টরি বলে আখ্যা দিতে চাইলে একান্তই আবশ্যিক। এটা হল ডকুমেন্টরির অন্তর্গত বাসনা, ডকুমেন্টরি চায়Ñ‘জগত-সংসারে যা কিছু যেভাবে আছে’Ñসে অবস্থার উন্মোচন, বিষয়বস্তুর গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণিক তথ্য সরবরাহ; বাস্তবতার শুদ্ধ নিরলঙ্কার চরিত্র অক্ষুণ্ণœ রাখতে বাড়তি নান্দনিকতা পরিহার। এই সাধারণ ঐক্যমত্যের পরে সর্বত্রই দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা শুরু হয়। সেটা হতে পারে কিভাবে একটা বিষয়ের বর্ণনা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে সেই প্রশ্ন, কিম্বা বেছে নেয়া বিষয়বস্তুর যথার্থতা বা জড়ো করা সাধারণ উপাদানগুলো ব্যবহারের ধরন নির্ধারণ নিয়ে। সে যাইহোক, ভিন্নতা ও বিতর্ক সত্ত্বেও ডকুমেন্টরির তিনটা পথই খোলা আছে সেটা পরিষ্কার— এনসাইক্লোপিডিক বা শিক্ষামূলক ধারা, ঐতিহ্য-সংরক্ষণ-বাদী ধারা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক ধারা। এই তিনটি ধারার নান্দনিক রীতিনীতির দিকটাও বিবেচনা করা যেতে পারে; সে দিকে আমরা পরে প্রবেশ করব।

বিশ শতকের প্রথম দশকে শিক্ষামূলক এবং সংরক্ষণ-বাদী এই দুটি ধারা ডকুমেন্টরি শব্দটির শোভা বর্ধন করেছে। একই সময়ে ফরাসি দেশে ‘ফিল্ম ডকুমেন্টিয়ারে’ বলতে নির্দেশ করত ভ্রমণ বা সংস্কৃতি বিষয়ক শিক্ষামূলক ফিল্ম। ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে, প্রাথমিক তর্কগুলো চালু ছিল এনসাইক্লোপিডিক আর্কাইভিং ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মজুদ করণের মধ্যে। অবশ্য, ইতিমধ্যে সমাজ সংস্কারক এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো ফটোগ্রাফিকে কাজে লাগানো শুরু করেছে, নানা বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে, শহরের দারিদ্র্য ও শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে সরব হতে। যদিও ছবির এই যুদ্ধংদেহী উদ্দেশ্যের ব্যবহার প্রথমদিকে ডকুমেন্টরি সংশ্লিষ্ট ছিলনা। উনিশ শতকের ত্রিশের দশক পর্যন্ত এর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল পুরোভাগে একচ্ছত্র জায়গা নিয়ে এবং যা এখনও সমান মাত্রায় জারি আছে। পরিভাষাটির শব্দার্থিক পরিবর্তন এসেছে প্রধানত অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রভাবে। বস্তুত, দুই মহাযুদ্ধের সময়কালে আমেরিকা ও ব্রিটিশ লেখকরা ফরাসি ডকুমেন্টয়ারে শব্দটি এস্তেমাল করে। তারা প্রথমে সিনেমায় এবং পরে ফটোগ্রাফিতে ‘ডকুমেন্টায়ার’ কথাটা আনে। স্টেজ না করে তোলা সাক্ষাৎ দুনিয়ার ছবি এবং সামাজিক বাস্তবতা উপস্থাপনের কাজগুলো বুঝাতে এর সাধারণ ব্যবহার ঘটে। এইভাবে ডকুমেন্টরি অভিধাটি সত্যের তালাশ কিম্বা ঘটনার বিবরণ সন্ধানে জোরালো নৈতিক এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধ আশ্রয়ী ব্যঞ্জনা অর্জন করে। ইংরেজির মারফত ঘটা এই অবস্থান্তর ও নৈতিক মূল্য যোগকে শুকরিয়া জানাতে হয়। একইসাথে তা নান্দনিক আলোচনারও সূচনা করে অতঃপর ইউরোপে ফেরত আসে। তবে, সর্বজনস্বীকৃত-ভাবেই আমেরিকানদের চেয়ে জর্মান ও ফ্রান্সেই এর ব্যঞ্জনা ব্যাপকতা লাভ করেছে।

ঘটনা যাই হোক, এর অন্যান্য ব্যাখ্যাগুলোও কখনও সম্পূর্ণভাবে চুপসে যায় নাই, এমনকি অ্যাংলো-স্যাক্সন টেক্সট থেকেও না। ধাঁধার মত মনে হলেও, জিগা ভারটভকে প্রথম দিককার ব্রিটিশ তাত্ত্বিক জন গিয়ারসন এবং পল রুথা, ডকুমেন্টরির জনক হিশাবে সাব্যস্ত করেন নাই। বরং তারা নির্বাচন করলেন খুবই গতানুগতিক ধারার রোমান্টিক ও অতীতকাতর গবেষক রবার্ট ফ্লাহেট্রিকে। একইভাবে ফটোগ্রাফিতে জনকের মর্যাদা পেলেন পুরাতন দলিল দস্তাবেজের মোহাফেজকার ইউজেন আঁজে, ফ্লাহেট্রির মত ইনিও ছিলেন অতীতচারী। ‘ডকুমেন্টরি ঐতিহ্যের’ সিলসিলায় ত্রিশ দশক থেকে আঁজে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণদের মধ্যে ছিলেন— হেনরি লি সেকউ, ম্যাথিউ ব্রাডি, জ্যাকব রিস, লুইস হাইন, পল স্ট্যান্ড, ওয়াকার ইভান্স, ডরথিয়া ল্যাঙ ও ফার্ম সিকিউরিটি এডমিনিস্ট্রেশন প্রমুখ। দেখা যাবে এদের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলটাই প্রকট। এসব রেকর্ড কর্মে যেমন নাই বিধিবদ্ধটা, তেমনি নাই কোন যৌক্তিক শৃঙ্খলা। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় আঁজের সংরক্ষণ-বাদী দৃষ্টিভঙ্গি (ফটোগ্রাফি কোনকিছুকে জীবিত রাখে) এবং হাইনের সমাজ সংস্কারের বাসনা (ফটোগ্রাফি পরিবর্তন আনে) আর ইভান্সের আক্ষরিক অনুকৃতির মাঝে মূলত সম্পর্কটা কোথায়?
বাস্তবতার বিশ্বস্ত উপস্থাপনের ধরণ থেকেই পদ্ধতিগত পার্থক্য বড়সড় হয়ে আবির্ভূত হয়। নির্মাতার কি উচিত হবে বিষয়ের আপাত নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অন্তরালে লীন হয়ে থাকা, অথবা প্রামাণ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য কি তার উপস্থিতি অপরিহার্য? নান্দনিক বিধিবদ্ধটা কাম্য নাকি সেটা বরং তিরষ্কারযোগ্য?

প্রামাণ্য আলোকচিত্রের ভেতর বাহির, অতঃপর

মার্থা রসলার
অনুবাদ
এস এম মনিরুজ্জামান ও সম্পাদনা পর্ষদ

আমরা যদি আজও ডকুমেন্টারির মত একটা নিত্য পরিবর্তনশীল ধারণার অর্থ ভালভাবে বুঝতে চাই, দুর্ভাগ্যের বিষয় তাতে পিছনে ফিরার প্রয়োজন পড়ে খুব সামান্যই। সময়ান্তরে ডকুমেন্টরি কথাটার অর্থ নানান রূপ এবং ভঙ্গি অদল বদলের মধ্যে দিয়ে গেছে। ফলত, পরস্পর বিরোধী সংজ্ঞাও পয়দা হয়েছে। ডকুমেন্টরি ধারণাটির অসঙ্গতি এর নিজস্ব ইতিহাসের কোন শেকড়ে জড়িয়ে আছেÑ অতীতে পুনর্দৃষ্টি কেবল তার হদিসটুকু উন্মোচিত করবে। ডকুমেন্টরি অভিধাটি আদতে কি অর্থ ব্যক্ত করে সে বিষয়ে আজও কেউ নিশ্চয় জ্ঞান হাসেল করতে পারে নাই ফিল্মের কথা টানলে, আপাত একটা সংজ্ঞা পয়দা করা সম্ভবÑ মোটা দাগে যা কিছু ফিকশন নয় তাই ডকুমেন্টরি। কিন্তু ফটোগ্রাফিতে ডকুমেন্টরির বিপরীতে এমনতর কিছু দেখানো কঠিন, কেননা ফটোগ্রাফির মধ্যে কোন জিনিসকে আমরা ফিকশন বলে আলাদা করে দেখাব? কাজেই ডকুমেন্টরি অভিধাটির প্রকৃত পরিসর নির্ধারণের মুশকিলটাও এখানেই নিহিত। সে যাইহোক, অর্থবোধকটার এই অস্পষ্টতা চলার পথে বিশেষ বাধা হয়ে দাঁড়ায় নাই; বরং এর সাফল্য এবং ছড়িয়ে পড়ায় সহায়ক বনেছে, জগত জুড়ে নানান কিসিমের নির্মাতারা নিজের কাজটাকে এই তকমায় মুড়িয়ে চালিয়ে দিয়েছে, মানুষের কাছে ফেরি করেছে। গত প্রায় এক শতক জুড়ে ডকুমেন্টরির প্রভাব-প্রতিপত্তির বড় কারণ রয়েছে অভিধাটি দেদারসে ব্যবহারের এই অবাধ স্বাধীনতায়।

 

…একটি ছবিতে দেখা যায় ফ্রান্সের গ্রামের ছায়াঘন বীথিকা (দু’ ধারে গাছের সারি অলা রাস্তা) দিয়ে এক লোক আর এক পিচ্চি কালো গোল ক্যাপ পরে একটি বাইসাইকেলে চড়ে যাচ্ছে— সাইকেলের পেছনে ঝুলছে একটি রুটির ব্যাগ। এই ছবিটাই আমি বছর-খানেক আগে দেখছি। ডয়েল ডেইন বার্নবাখ বিজ্ঞাপন সংস্থার জন্য এলিয়ট এরউইট পঞ্চাশের দশকে ছবিটা তুলছিলেন। এলিয়ট ছবিটির জন্য ১৫০০ ডলার পেয়েছেন। ছবিটি লাগেনি’। তাহলে আলোকচিত্রও কি সভ্যতার মতই, শোষণের উপর ভিত গেড়ে দণ্ডায়মান? আমি জবাবে বলেছিলাম, ‘ইন দিস প্রাউড ল্যান্ড’ নামক বইয়ে ল্যাঙের টুকে রাখা নোট থেকে উদ্ধৃতি উল্লেখ করছে যে, ‘তিনি (থমসন) ভেবেছিলেন যে, আমার তোলা ছবি তাকে সাহায্য করতে পারে এবং এই ভেবে তিনি আমাকে ছবি তুলতে দিয়েছিলেন’। আমার বন্ধু লেবার ফটোগ্রাফার পাল্টা জবাবে বলেন: ‘আলোকচিত্রটির প্রকাশনার ফলশ্রুতিতে স্থানীয় কর্মকর্তারা অভিবাসীদের ক্যা¤েপর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। তাতে মিসেস থমসন সরাসরি উপকার না পেলেও অন্যরা পেয়েছে। মিসেস থমসন ব্যাপারটি ভুল বুঝেছেন’। তার এই জবাব শুনে ফটোগ্রাফির গভীরে বসত করা একটা ফাটল আমার কাছে পরিষ্কার হল। একটি ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফির দুটো মুহূর্ত ধরা পড়েঃ প্রথমটি তাৎক্ষণিক, কেজো উদ্দেশ্য পূরণ করে। যেখানে বাস্তবতার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা থেকে একটা অংশ তুলে আনা হয় বা তৈরি করা হয় প্রতিনিধিত্ব শীল সাক্ষ্য হিশাবে। একেবারে আইনি অর্থে প্রামাণ্যের দাবি নিয়ে কোন সামাজিক প্রথার পক্ষে বা বিপক্ষে আদর্শিক বা তাত্ত্বিক সমর্থন জ্ঞাপন করে। দ্বিতীয়টি প্রথাগত ‘নান্দনিক- ঐতিহাসিক’। এইখানে চৌহদ্দিটা অনেক আলগা। সামাজিক ভূমিকা গৌণ, নান্দনিকতাই মুখ্য। অর্থাৎ একটি আলোকচিত্র দর্শকের চিন্তা উসকালো কি না তা বিবেচ্য নয়। দর্শকের দিলের মাঝে নান্দনিক আনন্দের হিল্লোল বয়ে দিতে পারল কিনা সেটাই সাফল্যের পরিচায়ক। সেটাই একটা ছবি কতটা সুসংগঠিত হয়েছে তা বিচারের মাপকাঠি। অর্থের কোন ঐতিহাসিক নির্দিষ্টতা না মানা আসলে অনৈতিহাসিক অবস্থান গ্রহণের নামান্তর। কিন্তু সময়ের দিক থেকে ছবিটি যে অতীতের গর্ভে নির্মিত সে বিষয়ে আবার তা ‘ইতিহাস মনষ্কতা’ বজায় রাখে। ছবির ব্যাখ্যা বা রাজনৈতিক ও রূপকার্থের মধ্যে দাণ্ডিক স¤পর্ক অস্বীকার করে গোপন অর্থ আবিষ্কার করার এই প্রবণতাটি সত্যিই বিপজ্জনক। এই মার্গের সাধুরা মনে করে শিল্প তথা আলোকচিত্রের সুনির্দিষ্ট বাধন সূত্র আলগা হলে কিংবা সময়ান্তরে তা আবছা হয়ে আসলে বরং সারবত্তা সমঝানো সহজ হয়। কারণ তখন এর নান্দনিক রূপ প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। (যদিও আবার সামাজিক মনোভাব নামক অস্পষ্টতার কুশনে পেতে রাখে যাতে শেষে ছবি রহস্যময়টায় খাবি না খায়।) আমার দাবি মতাদর্শ নিরপেক্ষ নন্দনতত্ত্ব বলে কিছু নাই। ইমেজের প্রতি আমাদের সম্পর্কের যেকোনো ধরনই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি জাত, আরও খাস করে বললে সাংস্কৃতিক উৎপাদনের সামাজিক বোঝাপড়ার ভিতরে নিহিত। (ডরথির প্রকাশিত মন্তব্য ধর্তব্যে নিলে এমনই মনে হয় যে, তিনি এই সামাজিক বোঝাপড়া সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, কিন্তু সাংস্কৃতিক আত্মীয়করণের প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে অনেক আগেই কাজটি এই পরিপ্রেক্ষিত হারিয়ে বসেছে।)

বাস্তবে আলোকচিত্র চর্চার ক্ষেত্রে এরকম ধারণা প্রয়োগের সমস্যা হল, এটা ভুলে যায় যে, সঠিক নন্দন তাত্ত্বিক ভাবনারও বদল ঘটে। কারণ এটা এই সত্য এড়িয়ে যায় যে, নির্দিষ্ট বৈষয়িক বাস্তবতা ছাপিয়ে যেতে সক্ষম অর্থের বিভিন্নতা নয় বরং ঐতিহাসিক স্বার্থই কোন রূপ বা কাঠামো অর্থ প্রকাশে পর্যাপ্ত কিনা তা নিয়ন্ত্রণ করে। সবচে বড় কথা ইতিহাস আপনাকে দুই বার আন্দাজ করার সুযোগ দেয় না। আলোকচিত্রের প্রথাসিদ্ধ (ষবমরঃরসধঃব) ইতিহাসে জেকোভ রিসের পাশাপাশি লুইস হাইন, আর্থার ফেলিগের সাথে জানি লিওন যে, একত্রিত হয়েছে তার হেতু নান্দনিক অভিযোজনগত স্বভাবে। স্পষ্টতই ডরথি ও লেবার ফটোগ্রাফার-এর মত যারা কাঁচা ইন্দ্রিয়কে অর্থ সঞ্চারের শক্তিশালী উপায় সমঝেছেন তারা ধ্রুপদী সৌন্দর্যতত্ত্বের অপরিসীম মতাদর্শিক শক্তির বিরুদ্ধতা করছিলেন। এই ধ্রুপদী সৌন্দর্যতত্ত্ব মতে সর্বজনীন রূপের সন্ধানে নেমে দুনিয়া থেকে আমরা কেবলমাত্র শ্বাশত নান্দনিকতার আভাস পেতে পারি।

বর্তমানে শিল্পকর্ম মাত্রেই প্রেক্ষিত বিচ্ছিন্ন করে দেখার যে, সাংস্কৃতিক ধুন্দমার চলছে তার ফলে এই বিষয়টি অনুধাবন প্রকারান্তর অসম্ভব। বিশেষত, ল্যাঙ এবং লেবার ফটোগ্রাফারের মত যারা তারা এবং তাদের কাজকে কার্যত অবমূল্যায়নই করা হয়। কাজের সাথে আলোকচিত্রীর নিজের যে সম্পর্কটা আমার মনে হয় আমি তা ভিতর থেকে বুঝি। সত্যিকার অর্থে তাদের অনুমিত স্বেচ্ছাধীনটা বলতে বুঝায় নিজের সমগ্র কাজের ভিতরে ঐ বিশেষ ছবির অবস্থান এবং ফটোগ্রাফির দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ততা। কিন্তু আমি একইসাথে আত্মরক্ষামূলক এই জোরাজুরি দেখলে ধৈর্য ধরতে পারি না। এটা এমনকি যে কারও মহৎ উদ্দেশ্যকেও শেষমেশ শোষকের হাতে হাতিয়ার বানায়।

স্মিথস্ক্রিয়া

তানজিম ওয়াহাব

সাইপেন দ্বীপ, আমেরিকার লাগামহীন বোমায় নাস্তা বুদ জাপানিরা। তাদের কেউ কেউ পরিবার নিয়ে গুহায় লুকিয়ে ছিল। আমেরিকানদের বোমাগুলো যেন পথ খুঁজে খুঁজে গুহাতে গিয়েই পড়ে, আর গুহা থেকে ক্রমাগত লাশ বেরিয়ে আসে। দু একজন জ্যান্ত মানুষ চোখে মৃত্যু ভয় নিয়ে ছুটতে থাকে, ছোট ছোট বাচ্চা, মা, দাদি। আমেরিকারই একজন ফটোগ্রাফার ছবিগুলো তুলতে থাকে। নিজের দেশের এই নির্বিচারে হত্যা তাকে ভয়াবহ পীড়া দেয়। কিন্তু সেতো দোটানায় পড়ে গেল। একদিক থেকে এই ছবিগুলো সেই জায়গায় তোলাটা ফটোগ্রাফার হিশাবে তার দায়িত্ব মনে হয়, আবার আরেকদিকে যুদ্ধের এই আশাহীন, নিস্তেজ ছবিগুলো তোলাটাও অর্থহীন মনে হয়। ছবি তুলতে গিয়ে এমন দ্বিধা ইউজিন স্মিথের জীবনে বারবার আসে, সমাধানও সবসময় মেলে না। কিন্তু ইউজিন ছবিটা তুলে যায়, আর ছবিগুলো বদলাতে থাকে।

সময়টা বোঝার চেষ্টা করেন। ইউজিন যখন তরুণ টগবগে যুবক, পৃথিবী তখন অনেক গরম হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা, রক্ত, নির্বিচারে হত্যা। সে বারের যুদ্ধে ইউজিন নিজেও প্রচণ্ড আহত হয়, আর এরপর টানা দুই বছর বিছানায় পড়ে থাকে। বিছানার দিনগুলোতে ইউজিন জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক করে যুদ্ধের আর কোন ছবি তুলবে না। হয়ত যুদ্ধের বিপরীত কোন ছবি তোলা দরকার, যেই ছবি দেখলে বাঁচতে ইচ্ছা করবে। তাই দুবছর পর প্রথম ছবিটা তুলে নিজের ছেলে-মেয়ের, বাড়ির সামনের বাগানে। বাচ্চাগুলো তুলতুলে হাত দুটো ধরে কোন এক আলোর পথে যাচ্ছে, আলোটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেটে বের হচ্ছে, গন্তব্যটা অজানার, কিন্তু অনেক স্বপ্নের। ছবিটার নাম ওয়াক টু পেরাডাইস গার্ডেন।

ইউজিনরা বলতে চাইত জীবন ঘেঁষা গল্প, মানুষ ঘেঁষা গল্প। সংগ্রাম বা সবকিছু সামলে উঠার সাহস সঞ্চারী গল্প। তার ছবি জুড়ে অনেক কালো আর কন্ট্রাস্ট। তার ছবিতে একদিকে শোষিত, জীবন যুদ্ধে নুয়ে পড়া মানুষের দল, আর অপর দিকে না দেখা সব নায়কের এই যুদ্ধটা লড়ে যাওয়ার কাহিনী।

পেঁচালের ফাঁকে সুমনের একটা গান শুনাই। গিটারের অলস, মৃদু, টুং টাং আওয়াজ আর ভারি গলাটায় ছড়া কাটা কাটা সুর…
‘বাচ্চারা কেউ ঝামেলা করোনা উল্টো পাল্টা প্রশ্ন করোনা
চুপচাপ বসে থাক, বসে আঁক, বসে আঁক
আঁক ফুল নদী, আর প্রজাপতি, আঁক মিকি মাউস অগতির গতি
আঁক কুঁড়েঘর যদিও তোমরা পাকা বাড়িতেই থাক
এঁকো না কখনও স্বদেশের মুখ, দবড়ানো গাল ভেঙ্গে যাওয়া বুক
মর মর তার পরাণ ভোমরা…’

ঝামেলা করতে নিষেধ করা হল, অথচ ইউজিন ঝামেলা করবেই, উল্টো পাল্টা প্রশ্ন করবে, হয়ত সে চুপচাপ বসে থাকতে চায়নি। বদরাগী, ঝগড়াটে এই লোক নিজের শর্তে আপসহীন, জেদি। তার সাথে কাজ করা যে কারও জন্যই কঠিন ছিল। কোন কিছু ঠিক না মনে হলে ইউজিন কথা শোনাবে, পরিমিত থাকার প্রশ্নই ওঠে না, ঝগড়া হয়ত বাঁধবে, এরপর মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতসব শর্ত আর দেমাগ দেখানোর পরও মানুষ ইউজিনকে বাদ দিতে পারে নাই, তার কাজকে গ্রহণ করতে হয়েছে। দাঁড়ান, কারণগুলো আস্তে আস্তে বয়ান করার চেষ্টা করি। তার ছোটবেলা আর দশজনের মত খুব সুন্দর, সাজানো, গোছানো ছিল না। ইউজিন এর জন্ম ১৯১৮ সালে আমেরিকার কানসাসে। বাবা ছিল ছোটখাটো গমের ব্যবসায়ী, ব্যবসাতে লোকসান করে কোন এক সকালে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করে সে। ইউজিন ভীষণ চমকে যায়, ব্যথা সারিয়ে উঠতে অনেকদিন সময় লাগে। ভাইয়ের পোলিও ছিল, সংসারে অভাব ছিল। কিন্তু ইউজিনের মা ছিল বেশ শক্ত, বদরাগী আর আত্মবিশ্বাসী মহিলা। মা একাই তাকে মানুষ করে। ইউজিন অনেকটাই ছিল মা ঘেঁষা, মায়ের কথার অবাধ্য হওয়ার সাহস তখনও হয়ে উঠেনি।

সেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর ইউজিন মাতে ছবির গল্পে, ছবি যেন উছিলা, আসলে ছবি দিয়ে জীবনের গল্পে পৌঁছনোর চেষ্টা। ফটো স্টোরি কিম্বা নেরেটিভ ফটোগ্রাফি নামের এক নয়া জিনিসের চল তৈরি করে। আগের মত কোন একটা ফটোতেই নন্দন চর্চা না, বরং অনেকগুলো ছবি গেঁথে গল্প বয়ান করা। সেখানে প্রতিটা ছবিরই হয়ত নিজস্ব শক্ত বুনন থাকে, কিন্তু ছবিগুলো মিলে কোরাস এর মত একসাথে কাজ করে, দলে দলে গান গায়। একই সময়ের আগে পরে জেকব রিস, এডওয়ার্ড কার্টিস, লুইস হাইনরা একই বিষয়ের অনেকগুলো ছবি তুলছে, কিন্তু গল্পের শুরু আর শেষটা ভেবে ইউজিনের মত এত গুছিয়ে ছবিতে গল্প তখনও আসেনি…

বেসার-মঙ্গল

আরফান আহমেদ

ছবিগুলো দেখতে কেমন জানি। কোন কিছুই নাই ছবিগুলোতে। না আছে কোন মানুষ, না আছে কোন সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। আছে খালি বড় বড় শিল্প স্থাপনা, যেমন ব্লাস্ট ফার্নেস, ওয়াটার টাওয়ার, কুলিং টাওয়ার, গ্যাস টাওয়ার, উইন্ডিং টাওয়ার, কয়লা খনির স্থাপনা এই রকম বিদঘুটে আরও অনেক কিছু। আর কম্পোজিশন! তার তো কোন বালাই নাই। এইসব বড় বড় বিদঘুটে জিনিস ছবির একদম মাঝখানে। রুল অব থার্ড বলে যে কলা জগতে কোন কিছু বিদ্যমান আছে তা এই ছবিগুলো দেখলে বোঝা মুশকিল। আর আলো ছায়ার খেলা সে তো দূর-স্থান! সাদা কালো এই ছবিগুলোর কনট্রাস্টের কথা আর নাইবা বলি। এই রকম প্রাণহীন, মরা, গতিহীন, ব্যানাল ছবি তোলেন বের্ন্ড এবং হিলা বেসার।

সময়টা গত শতকের ষাটের দশক। প্রবল উন্মাদনায় ভরা একটা দশক। সময়ের এই উন্মাদনা এসে ধাক্কা দেয় আলোকচিত্রের দুনিয়াতেও। পুরনোকে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে ফালি ফালি করে ছুঁড়ে ফেলেন এই প্রজন্মের আলোকচিত্রীরা। কার্তিয়ে ব্রেসো গংদের সাম্রাজ্যের উপরে নেমে আসে একের পর এক আঘাত। দার্শনিক এবং নন্দন-তাত্ত্বিক আঘাত। রবার্ট ফ্রাঙ্ক, তার গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন মার্কিন দেশের পুব থেকে পশ্চিম। তার ছবি হয়ে উঠল ইতিহাস, বিদ্রোহী আলোকচিত্রীদের ইশতেহার, ব্রেসোর নির্ধারণই [উত্তুঙ্গ] মুহূর্তের একচেটিয়া দাপটের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ। উইলিয়াম ক্লেইন তার ৩৫ এম.এম. লেইকা ক্যামেরা আর ওয়াইড এঙ্গেল লেন্স নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন নিউ ইয়র্কের উত্তাল রাস্তায়, প্রবল আগ্রাসী ভঙ্গী, আর বিষয়বস্তুর সাথে তার এমন উন্মত্ত বোঝাপড়া তাকে বানিয়ে তুলল যুগের প্রধান পপ ফটোগ্রাফার। আর গ্যারী উইনোর্গ্যান ছবি তুললেন ছবিতে দুনিয়া কেমন দেখায় তা দেখার জন্য, ঘোষণা করলেন আলোকচিত্র তার প্রাণের ক্ষুধা মেটায়। ডিয়ান আর্বুয সমাজের প্রান্তিক মানুষদের পোর্ট্রইেট তুললেন, তুললেন সমাজ কর্তৃক ঘোষিত অস্বাভাবিকতা, ‘বিকৃতির’ ছবি। এই উত্তাল সময়ে বের্ন্ড আর হিলা বেসার তৈরি করে নেন নিজেদের আলাদা একটা ধারা। কিন্তু দুনিয়ায় এত্ত এত্ত ছবি তোলার বিষয় থাকতে তারা দু’জন এই বিষয় নিয়ে ছবি তুললেন কেন?

বের্ন্ড আর হিলা আদতে দুই লিঙ্গের দুইজন ভিন্ন মানুষ। তারা ছবি তোলেন একই সাথে। আর ছবির মালিকানা সমানে সমানে ভাগাভাগি করে নেন। তারা দুই জনই জর্মন দেশের। হিলা পুবের আর বের্ন্ড পশ্চিমের। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে হিলা পশ্চিম জর্মনের ডুসল্ডলফে চলে আসেন। তিনি ডুসল্ডফের কয়লা খনি, ই¯পাত কারখানা, লাইম স্টোন কারখানার স্থাপত্য শৈলী দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। ট্রেনের জানালা থেকে এসব দেখতে দেখতে এসবের প্রেমে পড়ে যান। আর বের্ন্ড এর ছেলেবেলা কেটেছে এমনি এক শিল্পাঞ্চলে। তার পূর্ব পুরুষেরা এমন কারখানাতেই কাজ করতেন। তাদের ছবির প্রধান বিষয় উনিশ শতকের এই সমস্ত স্থাপত্য, যা ঐ সময়টাতে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। এই সমস্ত স্থাপনা সমূহের স্থাপত্য শৈলী একটা নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে এবং সাথে সাথে অর্থনৈতিক বিকাশেরও। তাই তাদের মতে, মধ্যযুগের কোন স্থাপত্য সংরক্ষণ করা যেমন জরুরি তেমনি ভাবে এই সমস্ত শিল্প স্থাপনাগুলোও সংরক্ষণ করা জরুরি। এ কারণে তারা এই সমস্ত স্থাপনা সমূহকে ক্যামেরা বন্দী করে রাখার চেষ্টা শুরু করলেন। তাদের একটা ফক্স ভোগান ভ্যান ছিল। এই ভ্যানে করে ঘুরে বেড়াতেন আর ছবি তুলতেন। ঠিক যাযাবরের মতন, একজন হিলা তার প্রেমের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন হন্যে হয়ে, আরেকজন বের্ন্ড বারে বারে ফিরে যেতে চাইছেন তার ছেলেবেলায়। ঐ ভ্যানটার ভিতরেই ছিল তাদের সংসার, ছোট একটা ডার্করুম, আর ছেলে ম্যাকশ এর জন্য ছোট্ট একটা নার্সারি।

বেসারদের ছবির দেখলে মনে হয় এদের ছবিতে কম্পোজিশনের কোন কারিগরি নাই। খুব সাধারণ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে, কম্পোজিশন আসলেই সাদা মাটা। মূল বিষয়বস্তুর ডানে এবং বামে এবং উপরে নিচে অল্প একটু জায়গা ছেড়ে দেয়া। তাদের ওয়াটার টাওয়ার, গ্যাস টাওয়ারের ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায়। তাদের একটা ছবির কথাই ধরা যাক, কোন একটা জমজ পানির টাওয়ার। ছবিটি খুব স্ট্রেইট, একদম সোজাসুজি। রেইল পথের জমজ পানির টাওয়ার। বড় বড়, মোটা, প্রায় গোল দু’টি টাওয়ার। এই দু’টি টাওয়ারের সংযোগ সিঁড়িগুলো জিক-জ্যাক করে উপরের ঐ ধূসর অংশ ধরে উঁচুতে উঠে গেছে। টাওয়ার দুটির নিচে ঝোপ ঝাড়, শ্রমিকদের বাগান যা ছবির মূল বিষয়বস্তুর মাত্র এক তৃতীয়াংশ জুড়ে। আর মূল বিষয়বস্তু ছবির ঠিক মাঝখানে। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া। এই ছবিটির জন্য তারা অপেক্ষা করেছেন শীতকাল পর্যন্ত। যখন কুয়াশা থাকবে। এতে এই যমজ পানির টাওয়ারটার পিছনের যা কিছু আছে তা আর দেখা যাবে না, উধাও হয়ে যাবে।

যৌন নির্ভরতার উপাখ্যান

ন্যান গোল্ডিন
অনুবাদ
তাসলিমা আখ্তার
এটা এখনও আমার পরিবার

দশ বছর পার হল ব্যালাড বেরিয়েছে এবং সত্যিই আমি আর বইটির দিকে ফিরে তাকাইনি। ওটা তখনকার বিষয় ছিল; আর এখন এটা এই সময়ের। আমার লিখিত এবং আলোকচিত্রের দুই ধরনের ডায়েরির কাজই আমি অব্যাহত রেখেছি। আমার জন্যে এগুলো অতীতের দেখভালের কাজ করে, আর বর্তমানে আমাকে পরিপূর্ণভাবে জীবন যাপন করার সুযোগ করে দেয়। আমি এই বইতে ছবিগুলো রেখেছিলাম যাতে করে নস্টালজিয়া কখনও আমার অতীতকে বর্ণিল করতে না পারে। আমি টের পাই আমার নিজের জখম হবার ছবিগুলো আমি তুলেছিলাম যাতে আমাকে যে মেরেছিল সে মানুষটির কাছে আমি আর কখনও ফিরে না যাই।

আমি আমার জীবনের রেকর্ড রাখতে চেয়েছিলাম যাতে কেউ কখনও এতে রং চড়াতে না পারেঃ কোন নিরাপদ কিংবা পরিচ্ছন্ন বয়ান নয়, বরং চেয়েছি আসলেই যা ঘটেছিল এবং অনুভূত হয়েছিল তারই একটা রেকর্ড রাখতে। তবে আমি যা ভেবেছিলাম আলোকচিত্র ততটা কার্যকর ভাবে স্মৃতি ধরে রাখতে পারে না। এই বইয়ের অনেক মানুষই এখন মৃত, বেশিরভাগই ছিল এইডসে আক্রান্ত। আমি ভেবেছিলাম এই হারানোর বেদনা আমি আলোকচিত্রের মাধ্যমে দূরে সরিয়ে রাখতে পারব। আমি সবসময় ভেবেছি কারও কিংবা কোনকিছুর ছবি যদি আমি যথেষ্ট পরিমাণ তুলে রাখি, তাহলে আমি কখনওই সেই ব্যক্তিকে হারাব না, হারাব না সেই স্মৃতি, হারাব না সেই জায়গা। কিন্তু ছবিগুলোই দেখিয়ে দিচ্ছে আমি কতটা পরিমাণে হারিয়েছি। এইডস সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। সেইসব মানুষ যারা আমাকে সবচেয়ে ভালভাবে চিনত, বুঝত, সেইসব মানুষ যারা আমার ইতিহাস বহন করেছে, যাদের সাথে আমি বেড়ে উঠেছিলাম এবং যাদের সাথে একসাথে বৃদ্ধ হবার কথা ভেবেছি তারা সবাই চলে গেছে। খুব অল্প সময়েই আমাদের ইতিহাস কাটা পড়ে গেছে।

চারপাশের মানুষজনকে হারানোর ফলে নিজেকে হারানোরই একটা অনুভূতি হয়। কিন্তু একইসাথে ঐ বৃহত্তর পরিবারটা এখনও চলছে এই অনুভূতিও কাজ করে। এইডস সব দিক থেকেই আমাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। নিজ পরিমণ্ডলের মানুষগুলো যখন মারা যাচ্ছিল, নিজেকে ধ্বংস করার মহিমা পরিণত হয় একটা বেয়াড়া প্রশ্রয়ে: আত্ম-ধ্বংসী শিল্পীদের যে রোমান্টিক কল্পনা, দুর্ভোগ কিংবা যন্ত্রণা ছাড়া সৃষ্টিশীল কাজ হয় না, সৃষ্টিশীলতা ভীষণ ভালোলাগার এক অনুভূতি কিংবা চরম অতিরিক্ততা থেকেই আসেÑ এসব ভাবনা পাল্টে যায়। আমাদের জীবনে মৃত্যুর উপস্থিতি বেঁচে থাকার একটা সত্যিকার ইচ্ছা, বাঁচার জন্যে পরস্পরকে সাহায্য করা, পরস্পরের কাছে হাজির থাকার একটা ইচ্ছা নিয়ে এসেছিল। শুরুতে ড্রাগস সব কিছু তুঙ্গে তোলার বিষয় ছিল, শেষে সেটাই পরিণত হল শেকলে। আমি ড্রাগস নিতাম মূলত অনেক বেশি স্বপ্ন দেখার, অনেক বেশি স্বচ্ছতা পাবার জন্য, নিজের ভেতরের সব ধরনের বাধা ডিঙ্গানো, পরিপূর্ণভাবে স্বতঃস্ফূর্ত এবং বন্য হয়ে ওঠার জন্য। অনেক দিন এটা কাজও করেছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এটা চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন ছিল। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যকার সময়ে যখন আমি ব্যবহারের সীমা ছেড়ে অপব্যবহারের দিকে চলে গিয়েছিলাম তখন আমার জগত ভীষণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।

১৯৮৮ সালে ব্যালাড এর প্রথম প্রকাশের দু বছর পর, আমি ড্রাগস এবং এলকোহল ছাড়ার জন্য একটা ক্লিনিকে ভর্তি হই। ব্যালাড এর একটা কপি আমি আমার সাথে নিয়েছিলাম। অন্য রোগীদের ড্রাগস এবং যৌনতা বিষয়ে আগ্রহ তৈরির কারণ হতে পারেÑএই বলে নার্সরা প্রথমেই বইটি নিয়ে নিল। হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় দু মাস আমি আমার কাজ দেখার অনুমতি পাইনি, এমনকি আমার ক্যামেরা ধরারও। কিশোর বেলার পর এই প্রথমবারের মত আমি আমার বোঝাপড়া এবং অভিজ্ঞতা বাঁচিয়ে রাখার যে মাধ্যম ছবি তোলা, সেটা করতে সক্ষম হইনি। আমার মনে হয় ড্রাগস থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় ক্যামেরা হাতে না থাকাটা আমার বিক্ষুব্ধটাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। হাসপাতালের চৌহদ্দিতে আমি যখন চিকিৎসার মাঝামাঝি পর্যায়ে ঢুকলাম; আমাকে আমার ক্যামেরা ফেরত দেওয়া হল। আমি সেলফ পোর্ট্রেট’র (আত্ম-প্রতিকৃতির) একটি সিরিজ শুরু করি যেটা আমার শীঘ্রই সেরে উঠার ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে ওঠে। প্রতিদিন নিজের ছবি তোলার মধ্য দিয়ে আমি নিজেকে খুঁজে পেতে নিজের অবয়ব ফিরে পেতে সক্ষম হই। ওই সময়েই আমি ডে-লাইট (দিনের আলো) বিষয়টাও আবিষ্কার করি, এর আগে ফটোগ্রাফী যে আলোর সাথে সম্পর্কিত আমি এটা জানতামই না। আমি সবসময়েই ভাবতাম এভেইলেবেল লাইট (স্বাভাবিক আলো) বলতে বোঝায় শেষরাতের বারের লাল বাল্বের আলো।

ফলে এই নতুন কাজ—ড্রাগস ছাড়া আমার প্রথম ছবিগুলো আক্ষরিক এবং রূপক দুদিক থেকেই অন্ধকার থেকে আলোতে আসার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। সেই থেকে এ পর্যন্ত আমি যত কাজ করেছি ওইটাই ছিল যাত্রা বিন্দু। এখন আমার ছবিগুলো অনেক বেশি নিজের সাথে বোঝাপড়ার, নির্ঝঞ্ঝাট, আগের মত বাড়াবাড়ি আচরণের বিষয় নয়, যদিও সবকিছুর পরও আছে সীমাকে অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা। ছবিগুলোর মাঝের শক্তি এখন অন্যরকম, অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট, অনেক বেশি স্বচ্ছ। এখানে আলো আছে এবং অন্ধকার আছে, আছে এই দুয়ের মাঝেরও যা কিছু। ফটোগ্রাফি আমার জন্য হয়ে পড়েছে মুক্তির দিশা। এটা আমার অধোগতিকে বুঝতে এবং আমার পুনর্গঠনে সাহায্য করেছে।

আমার চারপাশের মানুষজনের ছবি এখনও আমি তুলছি। ব্যালাডেরও অনেক চরিত্র যেমন ডেভিড, ব্র“স, গ্রীয়ার, কীডথ, শ্যারন, ভিভিয়েন এবং তার ন’ বছর বয়সী ছেলে ওরাও আমার ছবিতে আছে। ফলে শিশুদের মধ্য দিয়ে এর মাঝে একটি ধারাবাহিকতাও থাকছে। আমার বন্ধুদের পরিবার এখনও পারস্পরিক নির্ভরতা, ধারাবাহিকতা, ভালবাসা এবং মমত্ববোধের ওপর ভর করে আছে। আমার বন্ধু এবং প্রেমিকদের মাঝে আমি কোন আবেগীয় দূরত্ব তৈরি করি না। আমি বিশ্বাস করি না আলোকচিত্র সময়কে থামিয়ে দেয়। আমি এখনও আলোকচিত্রের সত্যতায় বিশ্বাস করি যা আমাকে এই সময়ে সেকেলে করে তুলেছে। আমি এখনও বিশ্বাস করি ছবি জীবনকে নির্জীব না করে বরং বাঁচিয়ে রাখতে পারে। ব্যালাডের ছবিগুলো বদলায়নি। কিন্তু কুকি আর নেই, কেনি নেই, মার্ক নেই, ম্যাক্স নেই, ভিট্টোরিও আর নেই। আর তাই আমার কাছে এই বইটি এক বিরাট হারানোর বেদনা সংকলন একইসাথে ভালবাসারও উপাখ্যান।

ন্যান গোল্ডিন, মার্চ ১৯৯৬

জোড়াতালিতে মার্টিন পার

অনুবাদ
প্রজ্ঞা তাসনুভা রুবাইয়াত

.
প্রশ্ন: আপনি একজন ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফার, অথচ আপনাকে বাণিজ্যিক কাজের ব্যাপারেও অনুৎসাহী বলে মনে হয় না।

মার্টিন পার: না, একেবারেই না! ফটোগ্রাফি আসলেই একটা বাণিজ্যিক কাজ। এমনকি হাই আর্ট ফটোগ্রাফিও এইটার বাইরে না, তারাও প্রিন্ট বিক্রি করতে চায়! আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, এখন যদি আপনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ফটোগ্রাফারের কথা ভাবেন, দেখবেন যে সেইটা ফ্যাশন ফটোগ্রাফার স্টিভেন মিজেল না, আন্দ্রে[?] গার্স্কি, যিনি কিন্তু এখন আর্ট মার্কেটে সবার উপরে আছেন। মজার ব্যাপার হল যে আর্ট মার্কেটকে অর্থনৈতিক ভাবে অধিকাংশ সময়েই, বাণিজ্যের দরিদ্র ভাই হিশাবে দেখা হয়, সেটাই এখন ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকেও অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে! আপনি যে কোন ফটোগ্রাফারকে জিজ্ঞেস করে দেখেন সে কি করতে চায়, দেখবেন তারা হয়ত বলবেঃ আমি আমার নিজের মত কাজ করতে চাই, আমি আমার কাজ প্রিন্ট হিশাবে বেচতে চাই। আলটিমেটলি, এইটা কিন্তু একটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যই। সুতরাং, আমরা কখন্ওই এই বাণিজ্যিক ব্যাপার স্যাপার থেকে দূরে থাকতে পারব না।

 

প্রশ্ন: কিন্তু, শিল্পের ওপর অর্থনীতি যে কর্তৃত্ব করছে, আপনার কি মনে হয় না এইটা প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে আপনি এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন?

মার্টিন পার: কেন প্রত্যাখ্যান করতে চান, আমি সেটার কোন কারণ দেখি না। বাণিজ্যই কিন্তু সব ঘটনা ঘটাইতেছে। যদি জনসংখ্যার এক শতাংশের কথা ধরে বলা যায়, তবে তাদের কেউই সরকারি ভর্তুকি পাওয়া ঘেট্টোতে বসবাস করতে রাজি হবে না। ফটোগ্রাফিরই সেই ক্ষমতা আছে যে সে একইসাথে গণতান্ত্রিক, বাছ বিচারহীন, এমনকি মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্যও হতে পারে। যদি আপনার ঘেট্টো’র বাইরে বের হয়ে আসতে হয়, তাহলে আপনাকে বাণিজ্যিক বৃত্তের মধ্যে ঢুকতেই হবে। এই যে ফ্যাশন জগতের মানুষগুলা, বিজ্ঞাপন, পোস্টার, বিলবোর্ড এইগুলোতে আর কি। আর এইগুলাও আসলে আরেক ধরনের ঘেট্টো। এই দলটা আকারে একটু বড় আর কি। আপনি এইটাও বলতে পারেন যে, ভিজ্যুয়াল কালচারটাও একটা ঘেট্টো, কিন্তু আমাদের অবস্থান এইটার ভিতরেই। আপনি যদি পশ্চিমা দুনিয়াতে থাকেন, দেখবেন সেইখানে কেউই এইটার বাইরে না। আমাদের দুনিয়ার চারপাশ চিত্র দিয়ে ঘেরা, সেইটা অ্যাডভার্টাইজিংই হোক, আর ফ্যামিলি স্ন্যাপশটই হোক। মাথায় রাখা দরকার সবাই কিন্তু এখন ফটোগ্রাফার। এইটা অবশ্যই ফটোগ্রাফির একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। আর, সবসময়ই এর দর্শক বাড়া দরকার আর লোকজন যখন ফটোগ্রাফির ব্যবহার শুরুই করে, তখন এর মাঝে একটু বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করলে খারাপ কি!

প্রশ্ন: এইসব ‘ইমেজ ফ্লো’ এর বেশিরভাগই তো খুব গতানুগতিক, আপনি প্রায়ই এই বিষয়ে প্রপাগান্ডা শব্দটা ব্যবহার করেন। একটু ভেঙে বলবেন, এইটা দিয়ে আপনি কি বোঝাতে চান?

মার্টিন পার: যেসব ইমেজ আমরা দেখি তার বেশির ভাগই এক ধরনের প্রপাগান্ডা, কারণ প্রতিটা ইমেজেরই একটা এজেন্ডা থাকে। বিজ্ঞাপনী কিংবা বাণিজ্যিক জগতের ক্ষেত্রে কেবল বিক্রি হওয়াটাই ফটোগ্রাফির একমাত্র উপযোগিতা, যদিও সকল ফটোগ্রাফিরই একটা এজেন্ডা থাকে। অথবা ফ্যামিলি স্ন্যাপশটের ক্ষেত্রে বিষয়টা হল একটা ‘পারফেক্ট ফ্যামিলির’ ধারণা বিক্রি করা। আমি এইটা বলছি না যে, ইনডিপেন্ডেন্ট ফটোগ্রাফারদের কোন এজেন্ডা নাই, কারণ নিশ্চিতভাবে তাদেরও একটা এজেন্ডা থাকেঃ আপনি দুইজন ফটোগ্রাফারকে একই শহরে পাঠিয়ে দেখতে পারেন, দেখবেন তারা দুইজনই একে অপরের থেকে একদমই ভিন্ন কাজ নিয়ে আসবে। দেখা যাবে একজনের কাজ হবে খুবই ইতিবাচক, আরেকজনেরটা হবে একেবারেই নেতিবাচক।

প্রশ্ন: অনেক শিল্পীই ইদানিং ফটোগ্রাফিকে একটা কনসেপচুয়াল মিডিয়াম হিশাবে ব্যবহার করেনঃ বোঝাই যায় যে, তারা ছবিটার ব্যাপারে আগ্রহী এবং সেই ছবির প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। কিন্তু তারা সেই ছবির গঠন কিংবা কৌশলগত বিষয়ে খুব দৃঢ়ভাবে আগ্রহী হননা, এমনকি ফটোগ্রাফির ইতিহাস এবং সেখানে তাদের অবস্থানের ব্যাপারেও না। একটু আগেই আপনি বললেন, ছবি তোলাটা এখন খুব সহজ, সেটাও একটা কারণ। আপনি কি খেয়াল করেছেন, কিংবা ভেবেছেন যখন ফটোগ্রাফি শিল্প জগতের সাথে মিশে গেছে, তখনই কিছু একটা পরিবর্তন ঘটেছে?
মার্টিন পার: নিশ্চিতভাবে। এখন যেভাবে আপনারা ফটোগ্রাফিকে দেখেন, তাতে একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটে গেছে। দশ বছর আগেও টেট গ্যালারি ফটোগ্রাফ কিনত না, যদি না সেটা একজন শিল্পীর করা হত, কিন্তু এখন তারা অন্যান্য লোকজনের কাছ থেকে ছবি কেনে এমনকি আমার মত লোকের কাছ থেকেও। এইটা তাদের পরিচালনা নীতির বিশাল পরিবর্তন। এখন যদি আপনি একটা আর্ট ফেয়ারে যান, এক তৃতীয়াংশ ছবিই হল ফটোগ্রাফি।

প্রশ্ন: ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফারদের লক্ষ্য কিভাবে পরিবর্তন হচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?

মার্টিন পার: লাইফ ম্যাগাজিন কিংবা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এর কালার সাপ্লিমেন্টগুলোর মত প্রচলিত যেসব ফটোজার্নালিস্টিক পত্রিকাগুলো ছিল এগুলোর কাটতি ক্রমশ পড়তির দিকে। ফলে আপনি যদি একজন ফটোজার্নালিস্ট হন (মনে রাখবেন আমি কিন্তু একজন ফটোজার্নালিস্ট না), আপনাকে অনেক পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। আপনার সামনে এগোনোর জন্য দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে। আর আপনার যদি শক্তিশালী কাজ থাকে তাহলে বিশ্বাস রাখতে হবে যে কিছু মানুষ আছে যারা আপনার ছবি ছাপাবে। কিন্তু আপনার কমিশন পাওয়া এবং পত্রিকার কাজ ছাপানো তার থেকে অনেক কঠিন। সে জন্যই ম্যাগনামের মত এজেন্সিগুলো বেশ ভাল করছে কারণ তারা এটা বুঝতে পারছে যে, ফটোগ্রাফির ভবিষ্যৎ শুধু পত্রিকার পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটার সাথে মিউজিয়াম কিংবা ভ্রাম্যমান প্রদর্শনীর মত অন্যান্য কালচারাল ভেন্যুও যুক্ত হবে।

সংকলনমুনেম ওয়াসিফ ও তানজিম ওয়াহাব

 

 

দশটি ছবি, দশটি গল্প

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………

রশীদ তালুকদার

তানজিম ওয়াহাব

পাশের ছবিটার দিকে তাকাই, চোখ সরানো যায়না, মনে লেগে থাকে। চতুর্দিকে ঘিরে থাকা ইট নামক চতর্ভূজগুলো শক্তিশালী জ্যামিতিক বিন্যাস তৈরি করে আর ইট, পানি, কাদার চক্রাকার ঘূর্ণনের প্রায় মাঝখানে মাথাটা আঁটা। ছায়াবিষ্ট কালচে অংশগুলো নাটকীয়ভাবে শঙ্কা তৈরি করে। এত শক্তিশালী কম্পোজিশন রশিদের দীর্ঘকাল সালন ফটোগ্রাফি চর্চার প্রতিফলন, যা সেই সময়ের এদেশের অন্য ফটো সাংবাদিকদের থেকে ছবিগুলো আলাদা করে। আবার ছবিটা কিন্তু অনেক শীতল। কোন চিৎকার করে ওঠেনা। নিঃশব্দ, সংযত…

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

শহীদুল আলম

মুনেম ওয়াসিফ

গল্পটি রাজনৈতিক। কাজটি শুরু করেছিলেন ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর। কিন্তু সেখানে কেবল তিনি মিছিল বা বন্যার নিউজ মার্কা ছবি দিয়ে থেমে যাননি। বুনলেন অন্য গল্প। একদিকে রাখলেন বন্যায় না খেতে পাওয়া অপেক্ষারত শিশুদের ছবি অন্য দিকে মন্ত্রীর বাড়ির বিয়ের উৎসব, দুই জায়গায় থরে থরে মানুষ। শ্রেণী বৈষম্য। ছবিতে ছবিতে যোগাযোগ স্থাপিত হল। দেখালেন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাদের অবস্থান (তথা আদিবাসী নির্যাতন), ডলার আর টাকার থৈ থৈ করা চিংড়ি ঘেরের মাঝে ক্ষুধার্ত গরু, সর্বশেষে এরশাদের পতনে মানুষের উল্লাস। সাথে একটি খোলা চিঠি, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা। লেখাগুলো যেন ছবির অংশ হয়ে উঠল…

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

সাইদা খানম

তানজিম ওয়াহাব

তরুণী মেয়েটির কাঁধে ঝোলা, নিজ পাড়ায় ক্যামেরাটা লুকোতে হয়, পথে দাঁড়ানো লোকগুলোর আজেবাজে কথা কানে বাজে, কখনও সখনও মাথায় ঢিলও এসে জুটে। তার ছবি তোলাটা কতটুকু দরকার ছিল জানিনা, যখন পুরুষের এই সমাজে সময়টা ছিল অস্থির, মেয়েদের হাতে ক্যামেরাটা ধরারও সাহস নাই। তারপরও ছবিই বাদলকে টানে, বাদল নিয়ন্ত্রণ হারায়, ক্যামেরাটা আর ছাড়া হয়না। এভাবেই ষাটের দশকের কোন এক বিকেলে বাদল ছবি তুলেছে। ছবিতে দেখি বান্ধবী গুলনেহার, আলেয়া আর নাজমাকে নিয়ে বাদলের বেড়াতে যাওয়া, বুড়িগঙ্গার গা ঘেঁষে রূপমহল নামের পুরনো এক দালান, বিকেলের আলোয় রূপমহলের রূপসী দেয়ালের চোখ ধাঁধানো কারুকাজ, পুরনো দেয়াল জুড়ে ফাটা প্লাস্টারের ক্ষত, খাড়া পিলারগুলোর মত শান্ত সোজা লম্বাভাবে দাঁড়ানো শাড়ি পড়া ছিপছিপে গড়নের তিনজন তরুণী, যাদের মাঝের জন উল্টো দিকে ঘুরে রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

শেহজাদ নূরানি

মুনেম ওয়াসিফ

ধরা যাক মেরি এলেন মার্ক এর বম্বের ফকল্যান্ড রোডের ছবিগুলোর কথা; একদম কাছ থেকে দেখা, যেখানে কোন দ্বিধা নেই, কোন সংকোচ নেই, একদম খুল্লাম খুল্লা, রগরগে সেক্সের ছবি! কিন্তু এতটা কাছে যাওয়াও কি নৈতিক, যদি না হয় তাহলে ফটোগ্রাফার সীমানাটা টানবে কোথায়? নাকি নৈতিকতার ধারণাটি সেকেলে! ফটোগ্রাফাররা কি তাহলে লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি তুলে যাবেন? বিড়ালের মত পা টিপে টিপে, নিঃশব্দে; কেউ বোঝার আগেই মাছ নিয়ে দৌড়! তাহলে কি ফটোগ্রাফাররা চোর! মানুষের ভিতরের, ব্যক্তিগত, গোপন মুহূর্তগুলো চুরি করে বেড়ায়? আবার কাছে না গেলে ওদের জীবনের গল্পটা বলবে কি করে? এখানে দূরত্বটা কি শারীরিক না মানসিক? রবার্ট কাপা ‘ক্লোজনেস’ বলতে কি বুঝিয়েছেন তাহলে? আমরা বিষয়কে জানিয়ে ছবি তুলি তাহলে কাজটা অনেক সৎ হয়, আচ্ছা সৎ হয়ে ওদের জানিয়ে ছবি তোলা হল, ওদের সাথে খাওয়া-ঘুম সব হল, ফটোগ্রাফার ওদের ভাই কিংবা বোনের মত হয়ে গেল, তারপর ছবিগুলো দিয়ে কি করা হবে…

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

শফিকুল আলম কিরণ

তানজিম ওয়াহাব

মজেদার স্বামীরই হয়ত এই ছবিটা তোলার কথা ছিল, কিন্তু যৌতুক না পেয়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা মাজেদাকে এসিড মেরে পালায় সে। অন্ধ মজেদার স্বপ্নে শিশুটার চেহারা নির্মাণ আর বিনির্মাণ হতে থাকবে। আসল চেহারাটা দেখা সম্ভব নয়। হাসপাতালে ছবিটা তুলে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার কিরণ। খুব কাছে গিয়ে তোলা ছবি। কিরণ একজন পুরুষ, মাজেদার পক্ষে কি আর কোন পুরুষকে বিশ্বাস করা সম্ভব? এই কাজের অন্য ছবিগুলোতে খুব কাছ থেকে এই মানুষগুলোর কিছু ব্যক্তিগত আবেগ আর উচ্ছ্বাসের মুহূর্ত দেখা যায়, কিরণ কিছুটা হলেও বিশ্বাস তৈরি করে নেয়। পাশের ছবিটা বেশ সরাসরি, ফিল ফ্লাশে বাড়তি আলো দেয়, যাতে মুখ, ভঙ্গি, মুখের ভাঁজ, আবেগ, গোটাটাই দেখা যায়। দূরে দাঁড়িয়ে সতর্ক হয়ে কম্পোজিশনে কোন ফর্ম ধরার চেষ্টা নেই, ডজ বার্ন এর বিশেষ কেরামতি নেই।

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

পারিবারিক ছবি

মুনেম ওয়াসিফ

ব্যর্থতার দায় ঘুচাতে গিয়ে ভাবতে শুরু করি কেন এদের ছবি আমার প্রাণ ছোঁয় না। তার একটা বড় কারণ ধারণা করি ফটোগ্রাফি সম্পর্কে আমার আদিম জ্ঞান। যেখান থেকে আমি একটি ছবিকে ব্যবচ্ছেদ করতে শিখেছি, একদম টুকরো টুকরো করে, নির্মোহ ভাবে। তার লাইন, ফর্ম, ব্যাকরণ, জ্যামিতিক কাঠামো দ্বারা। ছবির আবেগ,অবস্থান আর রাজনীতি তো পরের কথা। এদিকে ফেসবুক, ফ্লিকার, আর ইন্টারনেটে খালি লাইকের পরে লাইক। কিন্তু এই গণ-ছবিগুলো বড্ড পানসে লাগে, মগবাজারের সস্তা হোটেলের ভেজিটেবেলের মত। কোনও গন্ধ, স্বাদ কিংবা আলাদা মোচড় নাই, সবই যান্ত্রিক পুনরুৎপাদন। আর যারা ফটোগ্রাফি (ব্যাকরণ) জেনে করেন, তাদের অনেকের ছবি আরও খারাপ। সবই মুখস্থ, প্রি-কম্পোসড, মিথ্যা ভণিতা—মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের মত। একটু সাইড লাইটের কেরদানি, ফরমের নৃত্য আর ফটোশপের ডজবাজি দিয়ে ছবি হয় না। বিস্বাদ লাগে!

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..
আজিজুর রহীম পিউ
তানজিম ওয়াহাব

টানটান উত্তেজনা! সময়ের আগে তাদের দৌড়াতে হয়। চোখে সানগ্লাস, পিঠে ক্যামেরার ব্যাগ, শরীরে ছড়ানো অনেকগুলো পকেট আর প্যাঁচ দিয়ে থাকা যন্ত্রপাতি-ক্যামেরা, ফ্লাশ, ফিল্ম। ভালই ভাবসাব! দুপুর বেলায় ঢাকা ভার্সিটি টিএসসির সামনে অনেকগুলো মোটর সাইকেল গায়ে গায়ে লেগে থাকে আর পাশে চায়ের টঙে আড্ডা চলে। তারা এই আছে, এই নাই। হঠাৎ ফোন বাজলেই বাইকটা চেপে দে ছুট। প্রচণ্ড গরম আর টেনশনে ঘেমে গোছল, রাস্তা জুড়ে ট্রাফিক জ্যাম, হর্নের কর্কশ ভোঁ ভোঁ শব্দ। ঘটনায় হাজির হওয়ার সাথে সাথেই বাকিদের ভীড়, কুস্তি লড়তে হয়, কনুই মেরে সামনে আসতে হয়। ফলাফলে কেউ ক্যামেরাটা ভেঙ্গে দিতে পারে, শার্টের কলার টেনে সজোরে কিল ঘুসি খাওয়াও সম্ভব। যত কিছুই হোক সবার আগেই সামনে গিয়ে ছবিটা পাওয়া লাগবেই, এডিটর সাহেব সেটাই চায়। বিদেশের প্রেস ফটোগ্রাফির সাথে তুলনা করলে এদেশের অবস্থা অনেক শোচনীয়, যেখানে পত্রিকায় একজন ফটো এডিটরের পদ নাই, কারও ভাল ছবি বোঝার বালাই নাই, ছাপানো ছবিতে ফটোগ্রাফারের নাম নাই, বেতন নাই, ভাল ক্যামেরা নাই। সবকিছু জেনেও তারা ছুটে।

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

জি এম বি আকাশ

মুনেম ওয়াসিফ

তত দিনে যা হবার তাই হয়ে গেছে। প্রথমে শহিদুল তারপর শেহজাদ, আবির, কিরণ—একের পর এক দুর্ধর্ষ কাজ। সব হার্ড কোর ব্ল্যাক অ্যান্ড ওয়াইট আর মানবিক মুহূর্তের ছবি। আকাশও শুরু করেছিলেন সেই ঘরানাতেই। অদ্ভুত মায়া ছিল ছবিগুলির মধ্যে। সমুদ্র পাড়ে উদাসী চালক আর ক্লান্ত ঘোড়া অথবা মায়ের হাতে তার বৃদ্ধ দাদাকে স্নান করানোর আন্তরিক দৃশ্য। প্রথম দিকের সাদাকালো কাজে আমরা সেই পুরনো ছবির ছায়াই দেখতে পাই। এমনিতে নতুন ফটোগ্রাফারদের উপর অনেক চাপ। ঘাড় সোজা করে দাঁড়ানো কঠিন। পুরনো কাঠামো ঝেড়ে ফেলা সহজ নয়। আবার নতুন ভাষা না হলে নতুন গল্পও বলা যাচ্ছে না। নিঃশ্বাস নেওয়াটাই যেন কষ্টকর।

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

রাসেল চৌধুরী

তানজিম ওয়াহাব

এর আগে বুড়িগঙ্গার দুরকম ছবি দেখেছি। এক ধরনের ছবি হল নৈসর্গিক কোন দৃশ্য। নিভ নিভ সন্ধ্যার আলোয় মস্ত বড় সূর্যটা ডুবে, আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা আর পানিতে মোশন ব্লারে ঝাপসা নৌকোগুলোর মাছির মত ছুটাছুটি। আরেক রকম ছবি হল হালের বুড়িগঙ্গায় কালচে পানির বোতল, আবর্জনা, বুদবুদ আর পাশে বা পেছনে ময়লা স্তূপ করে রাখা। দূষণের ছবি, হয়ত তা ব্যবহার হবে এনজিও’র পরিবেশ রক্ষার পোস্টারে।

পাশের ছবিটা এই দুইয়ের কোনটার দলে পড়ে না। ছবিতে পাওয়া যায় খুব ফ্যাকাসে, মরা এক আলো, সাদাতে আকাশে মেঘের কোন ডিটেল নাই, উজ্জ্বল কোন রঙ নাই, চোখ ধাঁধানো নন্দন নাই। নাটকের যেন বড়ই অভাব। ফটোগ্রাফার কি নাটকীয় ছবি তুলতে পারেনা? নাকি সে সেরকম ছবি আর তুলতে চায় না?

 

ঘুম যখন বিরতি

আলাপচারিতা- শহিদুল আলম

মুনেম ওয়াসিফ

 

স্যালন থেকে সোশাল

মুনেম ওয়াসিফ: তো আপনি বিপিএস ছাইড়া দৃক করলেন কেন? আপনি ফটোগ্রাফি নিয়া অন্য কিছু ভাবসিলেন যেইটা বিপিএস এ করা সম্ভব ছিল না?

শহিদুল আলম: বিপিএস নিয়ে আমার কোনই সমস্যা ছিল না। বিপিএস আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এবং আমি প্রতিষ্ঠানটাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। যেটা আমার কাছে পরিষ্কার ছিল যে, বিপিএস এর বাইরেও একটা জগত আছে। যদিও বা আমি এই ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি বা কিছু কিছু মাধ্যমে এই বাইরের জগতের সাথে পরিচিত করার চেষ্টা করেছি, এইটা একটা শৌখিন আলকচিত্রীদের জায়গাই ছিল। পেশাজীবী আলোকচিত্রীদের জায়গা সত্যিকার অর্থে ছিল না। সুন্দর ছবি করা ছিল বিপিএস এর আকর্ষণ, ছবির মাধ্যমে যে একটা কাজ করা সম্ভব সেইটা না। সমাজ পরিবর্তন, ছবির মাধ্যমে একটা আন্দোলন করা, ছবির মাধ্যমে একটা বক্তব্য প্রকাশ করা, ছবির মাধ্যমে প্রতিবাদ করা-এই বিষয়গুলো বিপিএস-এর ছিল না। এটাকে ভাল-খারাপ বলছিনা, বিপিএস এর এই জায়গাটাই ছিল না। এটা একটা দিক। আরেকটা হল, আমি যখন পাশ্চাত্যে বাংলাদেশকে কিভাবে দেখা হয় সেটা দেখি, সেখানে বাংলাদেশকে খুব নেতিবাচক ভাবেই দেখা হত। এখনও অনেক ক্ষেত্রে দেখা হয়। এবং এটা পরিবর্তন করার ব্যাপারে আমাদের কোন ভূমিকাই নেয়া হত না। যদিও বিপিএস সাংবাদিকতা করত না, কিন্তু যেই ক¤পিটিশনগুলো ওরা করত, সেখানে সুন্দর ছবি যেমন যেত, দারিদ্র্যও তেমনি থাকত। কিন্তু জীবন সম্বন্ধে বলার জায়গাগুলি সেভাবে ছিল না। তখন মনে হল স¤পূরক একটা কিছু হওয়া দরকার। বিপিএস গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, সেটা ঠিক আছে। সেই সাথে স¤পূরক একটা কিছু থাকা দরকার যেখানে আলোকচিত্রটাকে পেশা হিশাবে নেয়া যাবে। যেখানে সত্যিকার অর্থে পেশাজীবীদের জন্য একটা মঞ্চ তৈরি হবে। যেখান থেকে তারা তাদের কাজ দেখাতে পারবে, ছবির একটা ভাষা আসবে, এবং তারা ছবির মাধ্যমে প্রতিবাদও করতে পারবে। সেই রকম চিন্তা থেকেই দৃক শুরু।

 

মুনেম ওয়াসিফ: দৃক এর প্রথম দিকের কিছু ক্যালেন্ডার দেখলে বলা যায় যে আপনি সুন্দর বাংলাদেশের ছবি থেকে আস্তে আস্তে সরে আসছিলেন, যেখানে শ্রেণী বৈষম্য, লিঙ্গীয় অসমতা, নানান রাজনৈতিক অস্থিরতার ছবি উঠে আসছিল। আপনি সোশাল ডকুমেন্টারি বা ফটোজার্নালিস্টিক কাজের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন, যা দিয়ে সমাজকে পরিবর্তন করা যায়? কিন্তু দৃক এর এই সোশাল ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি প্রমোশন ফটোগ্রাফিকে খুব একমুখী করে দিয়েছে? যার ফলে আমরা ৯০’এর দশকে খুব একটা এক্সপেরিমেন্টাল কাজ দেখি নাই। আমি শুধু স্যালন ফটোগ্রাফির কথা বলছি না।

শহিদুল আলম: দৃক যখন শুরু হয় তখন যেই জিনিসটা চেষ্টা করা হয় যে, আমাদের কাজ পৌঁছে দেয়া। তখন শ্রম দেয়া হয় ওই নেটওয়ার্কটা তৈরি করার জন্য। কাঠামো তৈরি করা, আলোকচিত্রীদের একটা ভাল প্রিন্ট করার জায়গার ব্যবস্থা করা। আমরা কিছু কিছু জিনিস করি যা ফটোগ্রাফির সাথে একেবারেই স¤পৃক্ত না, কিন্তু হয়েছিল বলেই এখন ফটোগ্রাফি সম্ভব। আমরা ই-মেইল চালু করি নব্বই দশকের শুরু দিকে। কারণ আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা লন্ডন-প্যারিসে থাকব না, বাংলাদেশেই থাকব, কিন্তু আবার তাদের সাথেই আমাদের লড়াই করতে হবে। সেই লড়াইয়ের হাতিয়ারগুলি তৈরি করা। একটা বড় সময় গেছে আমাদের ওই জিনিসগুলি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে। এবং প্রথম যেই জিনিসগুলি হয়েছে যে দৃকের ক্যালেন্ডারগুলি যখন হয়, তখন দু’টো জিনিস ভিন্ন হয়। তার আগের সকল ক্যালেন্ডার ছিল রঙ্গিন। সাদা-কালো শুধুমাত্র ছাপানো হত বাজেট কম থাকলে। ভাল কাজের জন্যও যে সাদা-কালো হতে পারে, এই বোধ কিন্তু ছিল না। আমরা যখন প্রথম ক্যালেন্ডার করি, সাদা-কালো তো করিই, সেটাকে আমরা আবার স্ক্যান করি। এটা ছিল অদ্ভুত একটা চিন্তা। কারণ সস্তা করার জন্য যেখানে সাদা-কালো করা হয়, প্রসেস ক্যামেরায় সেপারেশন করা হয়, সেখানে স্ক্যানিং-এ গেলে তো রঙ্গিনই করতে পারতাম! এবং আমরা প্রথম ক্যালেন্ডার করি স্ক্যান করে সাদা-কালো এক রঙ্গে। দ্বিতীয় ক্যালেন্ডার করি স্ক্যান করে ডুয়ো-টোন। তৃতীয় ক্যালেন্ডার করি স্ক্যান করে সাদা-কালো ফোর কালারে! এটা তো তখন একটা অদ্ভুত জিনিস! আমি চার রঙ্গেই ছাপাচ্ছি, স্ক্যান করছি, কিন্তু সাদা-কালো ছাপাচ্ছি, ব্যাপারটা কি! এটা বোঝা খুব কঠিন ছিল। এবং তার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আনার প্রয়োজন ছিল কারণ ক্যালেন্ডার সংস্কৃতির মধ্যে ফুল, সুন্দরী মহিলা, মসজিদ বা ল্যান্ডস্কেপ-এই চারটা বিষয়ের বাইরে ক্যালেন্ডারে কোন বিষয়বস্তু হত না! ক্যালেন্ডারের মধ্যেও যে বিষয় আনা সম্ভব, এবং ক্যালেন্ডার যে সাদা-কালো হতে পারে দু’টোই কিন্তু নতুন একটা ব্যাপার।

মুনেম ওয়াসিফ: আপনি দৃক করার কারণে কি বিপিএস বা পূর্ববর্তী ফটোগ্রাফারদের সাথে কি কোন দূরত্ব তৈরি হয়েছিল?

শহিদুল আলম: দৃককে যখন ভিন্নভাবে দাঁড় করানো হয়, সবাই যে এটা বুঝেছে বা পছন্দ করেছে তা-ও না। কারও কারও হয়ত ধারণা ছিল এটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটা জিনিস তো আমরাও করি, যেটা ওরাও করে। যেমন প্রদর্শনী করি, ফটোগ্রাফি ক¤পিটিশন করি, আরও বিভিন্ন ধরনের জিনিস করি। তবে আমরা থেকে থেকেই যৌথভাবে কাজ করেছি। কিছু কিছু জিনিস যেটা আমি মনে করি হয়ত বিপিএস-এরই করা উচিত ছিল, করা হয়নি বলে আমরা করেছি। যেমন, গোলাম কাশেম ড্যাডি এবং মনজুর আলম বেগ এর যৌথ একটা প্রদর্শনী আমাদের এখানে হয়, ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ বলে। এইটা ঠিক যে আমার তখন জায়গা বেশি ছিল, করার সুযোগও বেশি ছিল। তবে শুরুর দিকে দৃক যে ফটোগ্রাফি চর্চার ক্ষেত্রে খুব বেশি ভিন্নতা করেছে তা না। ভিন্ন একটা দিক নিয়ে কাজ করেছে। বিপিএস বিপিএস-এর মতই ছিল এবং সমান্তরালভাবেই কিছুদিন চলেছে। যেটা হয়েছে, যেহেতু আমরা ডকুমেন্টারি কাজ অনেক বেশি করছিলাম তখন ওইদিকে জোর বেশি পড়েছে, অন্যান্য দিক হয়ত তুলনামূলক ভাবে কম হয়েছে। আমাদের আসলে তখন ফটোগ্রাফির প্র্যাকটিস নিয়েও ততটা ব্যস্ততা ছিল না, কাঠামো দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে ছিল।

 

সাদাকালোর রসায়ন

আলাপচারিতা- নাসির আলী মামুন

মুনেম ওয়াসিফ

মুনেম ওয়াসিফ: আচ্ছা তাইলে আপনি প্রথম দিকে, একদম মনে আছে এই যে ধারণাটা আপনার হইল, যে মানুষের চেহারার ছবি তুললে এইটারে পোর্ট্রেট বলে, উপর থেইকা তুললে এইটাকে এরিয়েল ফটোগ্রাফি বলে। প্রথম দিকে আপনি কার পোর্ট্রেট তুলছেন? মানে আপনার বন্ধু-বান্ধব…

নাসির আলী মামুন: আমিতো প্রথম ৬৮/৬৯/৭০ সালের দিকে বন্ধু-বান্ধব, আর ভাই-বোনদের ছবি তুলছি ঘরের মইধ্যে। সেইগুলি অল-মোস্ট স্টুডিওর পাসপোর্ট ছবি মতই আরকি। তাও সেই ছবির মধ্যে আমি খুব চেষ্টা করতাম প্লেইন একটা ওয়ালের সামনে, যেগুলিতে দাগ-টাগ আছে… কিংবা বড় মোটা কোন গাছ, ওরা সবাই ছবি তুলতে চাইত পার্কে গিয়া, রমনা পার্কে যাইতে চাইত, ধানমন্ডি লেকে, যেইটা আমার বাসার থাইকা কাছাকাছি ছিল। এই রকম গেছিও ওদের পীড়াপীড়ির কারণে, ঐখানে গিয়া আমি বড় বড় গাছ খুঁজতাম। বড় বড় গাছের ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি তুললে, গুড়িটা প্লেন একটা ওয়ালের মত দেখা যাইত, পিছের আমি গাছ-পালা কিছু আনতাম না। তাতে ওরা বিরক্ত হইত। ওরা পছন্দ করত ফুলের সামনে… পরে যখন বি টু সাইজের ছবি প্রিন্ট করতাম, খুব পপুলার একটা সাইজ ছিল তখন, এইটা দীর্ঘদিন, এইটিস পর্যন্ত— ছিল বি টু সাইজ। বি টু সাইজ টা এখনকার যে থ্রি আর সাইজটা আছে, ওটা থেইকা একটু ছোট আরকি। তো ওরা দেখলে বিরক্ত হইত কিন্তু আমার দেখতে খুব ভাল লাগত যে প্লেইন, অন্য ট্র্যাডিশনাল ছবির বাইরে। যে ফুল নাই, নদী নাই, লেক নাই, গাছ-পালা নাই, একটা প্লেন ব্যাকগ্রাউন্ড। তো এই রকম আমি মাথার মধ্যে তখনই আসল যে, মানুষের ছবি একটু আলো-আঁধারই রাখলে কিরকম হয়। তখন লেখকদের বই উলটাইতাম আমি, ফ্লপে যে লেখকের ছবি আমি দেখলাম, আমি তারে তো আমি দেখছি গত সপ্তায়, ওমর অনুষ্ঠানে, সে তো এই রকম না। তাঁর গর্ত আছে, সে কালো, কিন্তু মুখ ফোলা তাঁর, ফর্সা, তাঁর বসন্তে—র দাগ ছিল—দাগ নাই। এইটা কেমন? আমি তখন চিন্তা করলাম, না, এই রকম ছবি তো ছবি না। তখন আস্তে আস্তে আমারও চোখ আমি ঘুরাইলাম, যে মানুষের মুখের মধ্যে যা আছে, ক্ষত বিক্ষত এইগুলা সব আনতে হবে, শুধু তাই না, তার যে হৃদয়ের বেদনা, তার যে আনন্দ, তার যে উচ্ছ্বাস সব ছবির মইধ্যে আনতে হবে। তার কষ্ট ছবির মধ্যে থাকতে হবে, থাকা উচিৎ আমি মনে করি, ঐটাই পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি। এবং তখন আমার মনে হইত যে, ও বলত যে স্টুডিও ফটোগ্রাফি একটা সাইনবোর্ড আমি তখন দেখলাম যে, না আমি ত সাইনবোর্ড পেইন্টার হইতে চাই না। সাইনবোর্ড আঁকাইয়া হইতে চাই না।

 

মুনেম ওয়াসিফ: যেই সময়ের আপনি এই ফটোগ্রাফির প্রতি আপনার আগ্রহ ছিল, তখন কি আপনার কোন কবি, সাহিত্যিক কোন বন্ধু-বান্ধব ছিল? আপনি সিদ্ধান্ত—টা কখন নিলেন, যে আপনি এই বিখ্যাত লোকজন এর পিছন ছুটবেন বা এদের ছবি তুলবেন? কারণ ঐ সময়ে আপনি একদম পেসিফিকলি একটা অন্য জায়গায় ছবি তোলা শুরু করলেন এবং আমি যতদূর জানি সেই অর্থে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, বি পি এস, ঐ গুলার সাথেও আপনি সম্পৃক্ত ছিলেন না। আপনি একদম আলাদা, নিজের মত করে কাজ করে গেছেন…

নাসির আলী মামুন: আমি নিজের মত, নিজের স্বতন্ত্র রাস্তা নির্মাণ করার চেষ্টা করছি। ফটোগ্রাফি লেভেলের কেউ ওই ভাবে, মানুষ বলে না যে আপনার গুরু কে? ঐ রকম আমার কেউ নাই। বরঞ্চ এই পর্যন্ত পদে পদে হোঁচট খাইতে খাইতে… শিয়াল, কুমির, সাপের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইতে হইতে এই চল্লিশ বছর বেয়াল্লিশ বছর হইছে ফটোগ্রাফি কইরা আমি আসছি। সত্য কথা বলি—সফল ফটোগ্রাফার হইছি? না আমি হইতে পারি নাই। তোমাদের ছবি দেখলে আমি বুঝি যে, আমি কত ছোট আমি কত পিছে। আমি কোন জায়গায় আছি? আমি পাঠক তো, তারপরেও আমার কৃতিত্বটা কি? এইটা হইল যে, পুরা জাতিরে, প্রিন্ট মিডিয়ারে এবং প্রকাশনা জগতের চোখ এবং তাদের টেস্ট আমি ঘুরাইছি। ঐ চল্লিশ পাঁচ্চল্লিশ বছর আগের লেখকের ছবি বা আর্টিস্টের ছবি, ছবি না। আমি যে ছবি দিতেছি এইটা হইল তার আসল চেহারা। এইটা তার আত্মা, এইটা তার চেহারা, এইটা তার সিগনেচার, এইটা তার ঠিকানা। অন্তত মিডিয়ার লোকেরা এখন বোঝে, আর প্রকাশনা জগতের এরাও বোঝে। তো এদের এই চোখটা আমি ঘুরাইছি। এইটা নিয়া হয়ত বিশ বছর পর কেউ কাজ করলে করবে, যে আমি এই কাজটা প্রথম করছি বাংলাদেশে। আমি ভাল পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি করি নাই। ঐ প্রথম ফটোগ্রাফি থাইকা এই ফটোগ্রাফিতে আসছে, আনছি। মেকি ফটোগ্রাফি, যেটা স্টুডিও ফটোগ্রাফি—যেইটার মধ্যে কোন শিল্প নাই। শিল্পটা কি? তুমি কইতে পার যে শিল্পটা কি? শিল্পটা হইল যে-পরিষ্কার, স্বচ্ছ পানির মধ্যে তুমি একটা লাঠি ঢুকাইছ, সেই লাঠিটা স্বাভাবিক ভাবে মনে হবে যে সোজা, কিন্তু সোজা নাই। পানির মধ্যে যখন দেখবা লাঠিটা বাঁকা হইয়া গেছে ঐটাই শিল্প। সেইটা করার চেষ্টা করছি কিন্তু আমার পোর্ট্রেট সেই রকম হয় নাই, আমার পোর্ট্রেট পানির মধ্যে দেখা যায় সোজাই আসলে। কিন্তু আমি রাস্তাতো বানাইছি। তোমরা এই রাস্তার মধ্যে পিচ দিয়া রাস্তা ঢালাই করবা, এই রাস্তায় তোমরা এখন গাড়ি চালাইতেছ।

মুনেম ওয়াসিফ: কিন্তু বিখ্যাত মানুষের ছবি তুলতে গেলেন কেন? সদর ঘাটের একটা নৌকার মাঝি, বৃদ্ধ একটা চেহারা তার মুখেও ঐ কষ্ট আছে. আপনি তার ছবি না তুলে শামসুর রাহমানের ছবি তুলতে গেলেন কেন?

নাসির আলী মামুন: তার মুখেও কষ্ট আছে, কিন্তু তার আবার মেধা নাই। আমি হইলাম চিরকাল মেধাবী মানুষদের পূজারী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল মানুষ। কবি, সাহিত্যিক, লেখক, অর্থনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, সংগীত শিল্পী, পেইন্টার, আমি সব সময় এদের আচরণে, এদের কথা বার্তায়, জীবন যাপনে এবং এদের কাজ-কর্মেতে অভিভূত হইতাম। সবসময় ফ্যাসিনেটেড, এখনও হই। বিস্ময় ভাবে হই। যেমন যেকোনো মানুষ, বিখ্যাত মানুষকে দেখলেই আমি তাকে প্রথমে এমন একটা পর্যায়ে নিয়া যাই, মানুষের সাথে আলোচনা করতে গেলে, যে সে ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রেটি। না হইলেও আমি কথায় প্রমাণ করার চেষ্টা করি যে, সে ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রেটি। কাজেই আমি এমন একটা ক্যারিসমেটিক জগত নিজের মধ্যে তৈরি করছিলাম যে, ঐটা আমার ব্লাডের মধ্যেই মিশা গেছিল, বিখ্যাত লোক ছাড়া আর কিছু বুঝি না আমি। আর আমার পরিবারের মধ্যে একজন ছিল খুব নামকরা কবি, ছোট বেলা থেইকা তাকেও আমি দেখতাম। তাঁর জীবন-যাপন এই রকম পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে, খালি গাঁয়ে থাকে, লুঙ্গি পইড়া ঘুরতাছে। জসীম উদদ্দিন এর কথা কইতেছি। দেখলাম যে তাঁর সৃষ্টি কর্ম এই রকম, সারা বাংলাদেশের লোক পড়ে, বাংলা সাহিত্যের সবাই পড়ে। পিএইচডি করতাছে, ইউরোপ-আমেরিকায় তাঁর বই নিয়া কাজ হইতাছে, অনুবাদ হইতাছে। আমিতো এদের উপরেই কাজ করব। ছোট বেলায় মনে হইত আর কি। পরে যখন বাহাত্তর সালে আমি ক্যামেরা হাতে নিলাম প্রথম, আমার নিজস্ব^ কোন ক্যামেরা ছিল না। ধার করা ক্যামেরা, তখন আমি কাজে লাগাইলাম-এইসব মানুষদের যে ইমেজ আমার মধ্যে রইছে, সৃষ্টিশীল মানুষ এদের উপর কাজ করব, পোর্ট্রেট করব। এদের দুঃখ, বেদনা এগুলোর উপর কাজ করব।

মুনেম ওয়াসিফ: ধরেন রিচার্ড অ্যাভেডন, হেনরি কিসিজ্ঞারেরও ছবি তুলছে আবার মেরলিন মনরোর ছবি তুলছে। কিন্তু আপনার ছবি দেখলে আমি যেমন দেখি, আপনি খালি অ্যালেন গিনসবার্গ-এর মত মানুষের ছবি তুলছেন। আপনার ছবিতে বিখ্যাত মানুষদের ভিতরে আপনার একটা সিলেকশন আছে। আইদার তারা খুব রুচিবান, অথবা সত্যিকার অর্থেই তারা খুব ইন্টেলেকচুয়াল অথবা তারা আপনার অর্থে ভাল মানুষ। ধরেন খারাপ মানুষও তো বিখ্যাত হয়, আপনে তো সুইডেন আসলামের ছবি তোলেন নাই। তার মানে আপনার এই ভাল মানুষের মধ্যে একটা সিলেকশন আছে। এইটা কি আপনে মনে করেন আপনার ব্যক্তিগত রুচির জায়গা থেইকা তৈরি হইছে?

নাসির আলী মামুন: আচ্ছা, সত্যি বলি, প্রথমত আমার কাছে যারা গুরুত্বপূর্ণ তাদের পোর্ট্রেটই আমি করি। এখন তোমার মনে হইতে পারে… যে বিখ্যাতর কোন সংজ্ঞা নাই। আজকে যে বিখ্যাত, দশ বছর পরে সে দেখা গেল একদম বিখ্যাতই না। আবার আজকে যে বিখ্যাত না তারে হয়ত আমি রিকোগনাইজ করতে পারলাম না। যে রকম আরজ আলী মাতুব্বররে আমরা চিনি নাই। কত ঘুরত বাংলা একাডেমীতে, ন্যাশনাল বুক সেন্টারে ঘুরত, কেউ পাত্তা দিত না। পান খাইত, চা খাইত আর গল্প করত, কেউ চিনে নাই, আমিও তো চিনি নাই, আমিও দেখছি, আমিও তার ছবি তুলি নাই।

মুনেম ওয়াসিফ: সেই অর্থে বলি নাই মামুন ভাই। আমি বললাম যে, আপনার মানুষ চেনার ধরনটা বুঝতে চাই কারণ আমি দেখছি যে আপনি অনেক এরকম লোকের ছবি তুলছেন যারা এখনও বিখ্যাত হয় নাই, কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন, যে এই লোক মেধাবী এবং এই লোক হয়ত কিছু একটা হবে। এবং আপনি অনেক আগেই তার ছবি তুলছেন।

নাসির আলী মামুন: না, এইটা বোঝা যায়, যেমন আমার মনের মধ্যে একটা রাডার আছে ঐটা বুঝতে পারে যে, টোকা দিলে যেরকম কলসি বাজে না? এইটা বোঝা যায় যে, কার মধ্যে মেধা আছে। এই রকম আমি ভুল করছি শতকরা দুই জন। বহু মানুষের যেমন-রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এই লেভেলের ছবি তুলছি ওরা যখন কবি হয় নাই, বই প্রকাশ পায় নাই, সেভেন্টিজে এদের ছবি তুলছি। পরে আমি দেখছি যে, ম্যাক্সিমাম এদের বেশির ভাগই কিন্তু উৎরাইয়া গেছে। তারা সৃষ্টিশীল হইছে, দেশে নাম করছে, ভাল কাজও করছে। ৫০টা ১০০টা বইও অনেকের আছে, আমি তাদের ছবি তুলি নাই, এমন বহুলোক আছে। আমারে ফোন করে, ঘুরে ছবি তোলার জন্য এমন বহু লোক আছে। তুলি না ছবি।

 

 

খসড়া প্রেম; বিষয় কুদেলকা !

এমদাদুল হক

দৃশ্যত সহজ ও সাধারণ, প্রকৃত প্রস্তাবে জটিল, অসাধারণ এবং মাঝে মাঝে রহস্যময়; প্রায়শই ম্যাজিক মনে হয়। মলাটের ভিতরের পাতাগুলো ঘোরাচ্ছন্ন করে রাখে আমাকে। সাদা-কালো ছবি, প্রতি পাতায় বিস্ময়! ছবির চরিত্রগুলা আসে পুরাণ থেকে, আসে দৃশ্যকাব্য থেকে, আসে কোন এক উপন্যাস থেকে কিংবা এ সকল চরিত্ররাই পরবর্তীতে হয়ত বাস্তব থেকে পুরাণে যায় কিংবা দৃশ্যকাব্যে জায়গা করে নেয়। চরিত্রগুলোর চেহারার গড়ন, অভিব্যক্তি একরকমের নাটকীয়তার জন্ম দেয়। ছেষট্টিটি ছবি সম্বলিত তার একখানা চটি বই; আমার বিছানায়। আমি তারে খুঁজি, খুঁজতে থাকি, ক্ষণে ক্ষণে, অনেক সময় আবার প্রায় সময়। তারে পাই না; তার আলোকচিত্র নিয়েই আমি সন্তুষ্ট থাকি, থাকতে হয়। তারে বোঝার চেষ্টা চালাই। সে আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করে। বুঝি না পুরোপুরি, বুঝতে চাই, আরও জানতে চাই।

ব্যাগ ভর্তি ফিল্ম লইয়া অনেকদিন পর নিজের পাড়ায় ফেরত আসেন, ফিল্ম ডেভেলপ করেন কিংবা করেন না, কন্ট্রাক প্রিন্ট করলেন কিংবা করলেন না; আবার ব্যাগ ভর্তি নতুন ফিল্ম নিয়া বাইরইয়া গেলেন! মানুষটার কি ঘর সংসার নাই? বউ পোলাপাইন নাই? আমি ধন্দে পইড়া যাই।

 

বড় ভাই কয় লোকটা ক্যামেরা আর স্লিপিং ব্যাগ নিয়া ঘুইরা বেড়ান পথে পথে, তার আসলে কোন নির্দিষ্ট জায়গা নাই, যখন ছবি তুলতে বের হন তখনও তিনি জানেন না কই যাইতাছেন, স্লিপিং ব্যাগটা যখন রোল করে তখনও লোকটা নিশ্চিত না আইজ কোথায় রাইত কাটাইব! ঘুম যদি এতই জরুরি হয় তাইলে যে কোন জায়গাতেই ঘুমানো যায়, তাই এই বিষয়ে উনি চিন্তিত না। তিনি হাঁটেন আর ছবি তোলেন, ছবি তোলেন আর হাঁটেন। দিনের আলো ডুব মারলেই কেবল তিনি হাঁটা বন্ধ করেন, যেখানে হাঁটা থামান, সেইখানেই নরম ঘাসের উপর স্লিপিং ব্যাগটা বিছান, আর ভোরের আলোয় পাখির ডাকে প্রত্যুষে জাইগা উঠেন; একই জায়গায়! আবার হাঁটতে শুরু করেন। এইটাই তার জীবন! কয় কি হালায়? এমন ‘ছবি পাগলা’ তো জীবনে কম দেখছি। একদিন বৃদ্ধ হবেন, ছবি তুলতে আর সক্ষম থাকবেন না, এই বোধ থেকেই হয়ত এই লোক তার জীবনের প্রতিটি দিন ছবি তুলতেছেন। অথচ কেউরে ছবি দেখান না। বছরের পর বছর পইড়া থাকে তার নেগেটিভ। প্রিন্টও করেন না। দশ হাজার নেগেটিভ এখনও প্রিন্ট হয় নাই! তাইলে কেন ছবি তোলে লোকটা? দিনে দিনে অনেক কথা জমাইয়া রাখছি তারে জিগামু বইলা, কোন এক দিন কাছে পাইলে, প্রথমে একটা সালাম দিমু। পরে একটু সেলাম করুম তারপর জিগামু শইলটা ভালা?

হাঁটতে হাঁটতে ঢুইকা পরলেন পূর্ব ইউরোপের স্লোভাকিয়ার ক্লেনোভ্যেকের একটা রুমের মইধ্যে; আশ্চর্য হই, আপনে মানুষের এমন অভিব্যক্তি কি কইরা তোলেন? আমি খুঁইজা পাই না। মানুষজনের কি কোন সংশয় নাই আপনেরে নিয়া? নাকি আপনেরে কেউ পর ভাবে না? আপনে কি তাদের আপন লোক? ছবির লোকটা বিমর্ষ ছিল বেশ, হয়ত তার মন খারাপ, হয়ত তার পরিবারের কেউ মারা গেছে কিংবা অন্য কোন কারণে তার মনে বেজায় কষ্ট। হয়ত লোকটা কাঁদতে ছিল মহিলাটার সামনে। তখন মহিলাটা হয়ত সেই মানুষটার কান্না সহ্য করতে না পাইরা মানুষটার মাথা বুকে জড়াইয়া ধরল তার ডান হাতে, মানুষটারে শান্ত করার চেষ্টা করতাছিল, ভরসা দিতাছিল, ¯েœহ দিয়া কষ্ট ভুলাইয়া দিতাছিল, মহিলাটা বইসা ছিল একটা জানালার সামনে। জানালায় একটা সাদা পাতলা পর্দা আছিল, আর লোকটা দাঁড়ায়া ছিল মহিলাটার পাশে। লোকটার হাত ঝুলতেছিল। এই বিমর্ষতার মাঝে হয়ত একটু আশ্রয় খুঁজে পাইল লোকটা, তাদের চেহারায় এক ধরনের বিমর্ষতা বর্তমান থাকল; সেই ছবি আপনে তুললেন। আবার মহিলাটা আপনার দিকে তাকাইয়াও ছিল! আচ্ছা, মানুষগুলার কি এত দুঃখ?

তার ছবির বিশ্লেষণ আমি জানি না, বুঝি না, পারি না, পারি নাই। শুধু জানি তার ছবি আমাকে মোহিত করে। কোন কিছুর মোহে পড়লে, মোহের কারণ যদি জানা যায় তাইলে নাকি এইটারে ভালোলাগা কয় আর যদি কারণটা পাওয়া না গেল, তারে নাকি কয় ভালবাসা। এমন একটা ভালবাসা হইয়া গেছে এই মানুষটার ছবির সাথে। আমি আরও কাছে যেতে চাই। প্রেম বাড়তে থাকে…

 

ফিরিস্তি

মুনেম ওয়াসিফ ও তানজিম ওয়াহাব

…ওয়াসিফ: জিনিসটা যথেষ্ট ভাঙ্গছে। আসলে বাংলাদেশের এই ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট সোশ্যাল ডকুমেন্টরি নিয়া আমরা যতটুক ভীত, এত ভয় পাওয়ার কিছু নাই। আপনি যদি একটু গোনেন আমার কাছে মনে হয় না এদেশে সোশ্যাল ডকুমেন্টরির সাত আটটা ক্লাসিক কাজ বের হবে।

তানজিম: ক্লাসিক বলতে আপনি কি বুঝাইতেছেন?

ওয়াসিফ: ক্লাসিক বলতে, মানে কালজয়ী। ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা কিংবা সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালির মত, যুগে যুগে মানুষ যেটা মাইল স্টোন হিসাবে দেখবে।

তানজিম: আপনাকে আমি জিগাইলাম কারণ আপনার কথায় অনেকে আবার ক্লাসিক বলতে ডকুমেন্টরিতে ক্লাসিক এপ্রোচ না ভাবে। একটা অভিযোগ হইল এ জায়গায় ডকুমেন্টরিতে বেশি দেখা যায় ক্লাসিক এপ্রোচ, মানে গল্প বলার পুরানা পদ্ধতি এবং আধুনিক যুগে অনেকে ভাবে এইটা আমগো পিছায়া দিতাছে।

ওয়াসিফ: সেই একটা জায়গায় সাত আটটা স্ট্রং কাজ হইছে, হুইচ ইজ ফেয়ার এনাফ। এবং আমার কাছে মনে হয় পরের জেনারেশন এইটার মধ্যে অনেক ইন্টারেস্টিং টুইস্ট দিছে এবং অনেক জায়গা তৈরি হইছে। ধরেন সেইখানে রাসেলের মত ফটোগ্রাফার একটা আরবান ল্যান্ডস্কেপ করতেছে, কালারে একদম মেলানকোলিক একটা স্যাড কালার টোন, সেখানে ধরেন তুশিকের মত ফটোগ্রাফার তার নিজের জীবনের সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি নিয়া ছবি তুলছে।

তানজিম: কিংবা সুমনের মত ফটোগ্রাফার তার সেলফ পোর্টেট এবং নিজের মায়ের সাথে স¤পর্ক নিয়ে কাজ করছে, ব্যক্তিগত ইমোশন দিয়া…

ওয়াসিফ: হু… তার সাথে সাথে কিন্তু আমার ধারণা এই ভিন্নভাবে গল্প বলার চেষ্টা অনেক আগে থেকেই ছিল। ধরেন মুন্নি আপা বহু আগে তার ফ্যামিলি নিয়ে একটা স্টোরি করছে কিংবা সামিরা বহু দিন আগে ছবি এবং টেক্সট ওভারলেপ করে ইন্টারেস্টিং কাজ করছে। কিন্তু যেটা হইছে, ভিন্ন কাজগুলা করার যে প্রবণতা ছিল, সেটা কোন কারণে উৎরাইয়া যায় নাই, স্টাবলিস্ট হয় নাই, কোন কারণে ইন্টারন্যাশনালি লিংকড হয় নাই। কিংবা আমরা এই কাজগুলাকে পাটাতন দিতে পারি নাই। ফলে সেই কাজগুলা হারাইয়া গেছে। আবার এখন যে নতুন কাজ হইতেছে, যেটা আমাদের কাছে দেখে র‌্যাডিক্যাল মনে হইতেছে, মনে হচ্ছে যে ক্লাসিক্যাল ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফিতে এইটা টুইস্ট মারছে। ফটোগ্রাফাররা অনেক বেশি পার্সোনাল, ইন্টিমেট, কমপ্লি­কেটেট স্টোরি বলতেছে, এইটা কিন্তু একটা সময় ক্লিসে হয়ে যেতে পারে। যেইটা এখন ইনডিয়ায় হইছে। সব ফটোগ্রাফারই একটা মিডিয়াম ফর্মেটে, সেøা, বোরিং, একধরনের মিডিল ক্লাসের গল্প বলে। এবং সেই ছবিগুলা গ্যালারিতে যায় এবং গ্যালারিতে গেলে সেটা একটা এডিশনে বিক্রি হয়। এবং সেটা হিস্ট্রিক্যালি ফটোগ্রাফির নানান রকম কনটেক্সটের সাথে জড়িত বলে একটা থিউরিটিক্যাল প্যাঁচাল হয়। সো আমার কাছে মনে হয় প্রত্যেকটা সময়ই একটা নতুন গল্প বলার ধরন আসে, কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হল, যে গল্পটা আপনি বলেছেন সেই গল্পটার সাথে আপনি কানেক্টেড কি না। কিংবা আপনি ফিল করেন কি না।

তানজিম: সেই জায়গাটায় আমি বলি ‘ভিন্ন’ এবং ‘নতুন’ এই দুইটা শব্দই একধরনের ট্র্যাপ। আমরা ‘ভিন্ন’ বলতে আসলে কি বুঝাই? ‘ভিন্ন’ কি শুধুই আসলে ভিন্ন কিছু করার জন্যই? শুরুতে আমাদের কিন্তু সেরকম আর্গুমেন্ট ছিল না, আর্গুমেন্টটা ছিল একজন নতুন ফটোগ্রাফার আসলে কতগুলা জানলা খোলা পায় এবং সে কত বৃহৎ ভাবে ডকুমেন্টরিটা বুঝতে পারে। তারপর যেই জায়গাটা তাকে টানে, যে জায়গাটায় সে কানেক্টেড ফিল করে, নিজের সাথে সম্পর্ক খুঁজে পায়, যেটা সে বিশ্বাস করে, কিংবা যেটা তাকে অনেক এক্সাইটেড করে, ইন্সপাইয়ার করে, সে ঐ কাজটা নিবে। তার জন্য ইন্ডাস্ট্রিতে সেই সুযোগ আছে কি না?

ওয়াসিফ: আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয়, আমরা আসলে অনেক বেশি ফটোগ্রাফির ভিতরে আছি। এবং অনেক ধরনের ফটোগ্রাফিক স্কুল, দেখা, রাজনীতি এইগুলা নিয়া আমরা আসলে এত জর্জরিত! মাঝে মাঝে আমরা ফটোগ্রাফির যে একটা খুব সাধারণ, ইনোসেন্ট বিউটি আছে সেটার কথাও ভুলে যাই। কিন্তু ওইটাই আমার কাছে মনে হয় ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফির সবচেয়ে বড় স্ট্রেঙথ। ধরেন, মানে বাংলাদেশেই ধরেন, আমার খুব মজার লাগে ফ্যামিলি এ্যালবামে যে ছবিগুলা দেখা যায়, কিংবা ধরেন আমরা এইবার যে ছবিগুলা ছাপাচ্ছি, মানে হিন্দুরা মরা মানুষের যে ডকুমেন্ট করে, কিংবা ধরেন পুলিশ কিংবা মেডিকেলে কেস স্টাডির মত করে যে ছবিগুলা তোলা হয়, কিংবা যুদ্ধে আর্মির একজন ফটোগ্রাফার একদম ফটোগ্রাফিক এপ্রোচ বাদ দিয়ে একদম নিখাদ ডকুমেন্ট করার জন্য যে ডকুমেন্টগুলা করে… আমার কাছে মনে হয় ফটোগ্রাফির একটা ইন্টারেস্টিং জায়গা হইল ফটোগ্রাফাররা ছাড়াও এই ফটোগ্রাফি এবং ফটোগ্রাফ, দুইটা জিনিসকে নানান মানুষ নানানভাবে ব্যবহার করে। এবং এটা যদি আপনি ভাল করে দেখেন, এটার ভিতরে অনেক ভাঁজ আছে। এটার ভিতর অনেক তরিকা আছে এবং অনেক ইনোসেন্স, নাইভ, ইন্টারেস্টিং দেখার জায়গা আছে। আমাদের মাঝে মধ্যে এই জ্ঞানের গরিমা থেকে বের হয়ে একটু সহজ মনে ছবিগুলো দেখা দরকার। তাইলে হয়ত অনেকগুলা ছবি আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠবে। ইন দ্যা এন্ড অফ দ্যা ডে, আপনি আসলে কোন স্কুলে কেমনে কি ডকুমেন্ট্রি ফটোগ্রাফি করবেন এইটা ইম্পরট্যান্ট না, কাজটা যদি আসলেই ভাল হয় এবং ওটার ভিতর যদি প্রাণ থাকে, ওটা যুগের পর যুগ ধরে টিকে থাকবে।

তানজিম: হ্যাঁ। কিন্তু আরেকটা জিনিস হইল, যে ছবিটায় প্রাণ দিল, দরদ দিয়া তুলল, এই ছবিটা আমরা আসলে তুলি কার জন্য? আমরা কখনও তেমন একটা বলি না যে কারে দেখানোর জন্য ছবি তুলি। অলরেডি ইন্ডাস্ট্রির কথা বলছি, গ্যালারির কথা বলছি, পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলছি, বলছি আমি কি দেখাইতে চাই, আমি কি করে কানেক্টেট, কিন্তু এই ছবিগুলোর দর্শক কে? তারা আসলে কোন ছবিগুলা খুঁজে? কই ছবিগুলা পায়? যেমন আপনি বললেন যে অদ্ভূত কিছু ছবি আছে যেইটা ফ্যামিলির ছবি, বাংলাদেশে কিন্তু এই রকম ছবি নিয়া ইন্টারেস্টিং কিউরেশন এখনও হয় নাই। কেবল শুরু হচ্ছে ছবিগুলাকে ভাল করে দেখা, সংরক্ষণ করা, ছবিগুলাকে দেখানো। আমরা বাংলাদেশে যে ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফি করি, এইটা স্পেসিফিক্যালি এজেন্সি ওরিয়েন্টেড বা বিদেশি গ্যালারি ওরিয়েন্টেড, সাধারণ মানুষের আসলে ছবি দেখা খুব বেশি হয়ে ওঠে না বাংলাদেশে।

ওয়াসিফ: সেটা একদিক থেকে সত্যি এবং এই কথাটার অনেকগুলা ভাঁজ আছে। আমার কাছে মনে হয় ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে এইটা খুবই ইম্পরট্যান্ট। যেমন ধরেন সালগাদো যে ধরনের কাজ করে। আমরা খালি সালগাদোর সেই ছবিগুলাই দেখি যেগুলা জায়ান্ট, এপিক, ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট হিউজ স্টোরি। কিন্তু এর সাথে সাথে সালগাদোর একটা খুব ইন্টারেস্টিং এক্সিবিশন ছিল, ল্যাতিন আমেরিকার ট্রেনের ভিতরে ছবি পেস্ট করছে এবং সেই ট্রেনটা ল্যাতিন আমেরিকার বিভিন্ন শহরের মাঝখান দিয়ে গেছে এবং স্টেশনে যখন ট্রেনটা দাঁড়াইত, যাত্রীরা ঢুকত আর বের হইত এবং তারা ছবিগুলো দেখত, খুব ইন্টারেস্টিং কিন্তু। কিংবা ধরেন সুসান মাইসেলাস যখন তার তোলা নিকারাগুয়ার যুদ্ধের ছবি যুদ্ধের ২৫-৩০ বছর পর গিয়ে এক্সাক্টলি সেম লোকেশনে, যেখানে ছবিটা তুলছে, সেখানে ছবিগুলা এক্সিবিট করে এবং পাবলিকের সাথে যে ইন্টারেকশন হয় সেটাও খুব প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কিন্তু অন্য জায়গা থেকে আমার আরেকটা জিনিসও মনে হয় যে, সব ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফার যে ছবি দেখায় তা কিন্তু না। যেমন ধরেন কুদেলকা সারা জীবন অনেক কাজ করছে। কিন্তু খুব অল্প ছবি আমরা দেখতে পাইছি। যেমন ধরেন লাস্ট ১০ বছরে কুদেলকা কোন ছবি কাউকে দেখায় না। কিংবা ধরেন একজন স্ট্রিট ফটোগ্রাফার। কয়েকদিন আগে বলা হইছে রবার্ট কাপা আর তার বউ এর মেক্সিকার একটা সুটকেস আবিষ্কার হইছে, সেইখানে তাদের মেক্সিকো ট্রিপের হাজার হাজার নেগেটিভ ছবি। তো আমার কাছে মনে হয়, এখনকার ফটোগ্রাফির চল অন্যরকম। ডিজিটাল ক্যামেরা আসছে, আপনি একটা এজেন্সির সাথে রিলেটেড, সো ছবি তোলেন আর সাথে সাথে ডাউনলোড করেন। কি ওয়ার্ডটা ফিল ইন করেন, প্লাগ কানেক্টেড করেন, ছবি নিউইয়র্ক টাইমস-এ চলে যায়। নিউইয়র্ক টাইমস এর ব্লগে আপনার ছবি দেখা যায়, সেই ছবি আপনি আবার ফেইসবুকে পোস্ট করেন। সেখানে একশটা লাইক পরে এন্ড ইউ আর ইন এ কম্পিটিটিভ, সুপার স্পিড ফ্রেম ওয়ার্ক। সবসময় কিন্তু জীবনটা এই রকম হওয়ার কথা না, কিংবা সবসময় তাড়াহুড়া করে ছবি তোলারও দরকার নাই। আপনার কিন্তু দম নেবার সময় আছে এবং স্থির হবার সময় আছে। ধরেন ফটোগ্রাফিতো অনেক সময় জীবনানন্দ দাশের কবিতার মত করেও হতে পারে। আপনি আপনার নিজের খাতায় লিখবেন এবং সেটা রাখবেন। দীর্ঘ দিনে ছবিটার সাথে কিংবা কবিতার সাথে সাথে বড় হবেন এবং একটা পর্যায়ে গিয়ে হয়ত প্রকাশ করবেন।