জোড়াতালিতে মার্টিন পার

অনুবাদ
প্রজ্ঞা তাসনুভা রুবাইয়াত

.
প্রশ্ন: আপনি একজন ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফার, অথচ আপনাকে বাণিজ্যিক কাজের ব্যাপারেও অনুৎসাহী বলে মনে হয় না।

মার্টিন পার: না, একেবারেই না! ফটোগ্রাফি আসলেই একটা বাণিজ্যিক কাজ। এমনকি হাই আর্ট ফটোগ্রাফিও এইটার বাইরে না, তারাও প্রিন্ট বিক্রি করতে চায়! আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, এখন যদি আপনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ফটোগ্রাফারের কথা ভাবেন, দেখবেন যে সেইটা ফ্যাশন ফটোগ্রাফার স্টিভেন মিজেল না, আন্দ্রে[?] গার্স্কি, যিনি কিন্তু এখন আর্ট মার্কেটে সবার উপরে আছেন। মজার ব্যাপার হল যে আর্ট মার্কেটকে অর্থনৈতিক ভাবে অধিকাংশ সময়েই, বাণিজ্যের দরিদ্র ভাই হিশাবে দেখা হয়, সেটাই এখন ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকেও অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে! আপনি যে কোন ফটোগ্রাফারকে জিজ্ঞেস করে দেখেন সে কি করতে চায়, দেখবেন তারা হয়ত বলবেঃ আমি আমার নিজের মত কাজ করতে চাই, আমি আমার কাজ প্রিন্ট হিশাবে বেচতে চাই। আলটিমেটলি, এইটা কিন্তু একটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যই। সুতরাং, আমরা কখন্ওই এই বাণিজ্যিক ব্যাপার স্যাপার থেকে দূরে থাকতে পারব না।

 

প্রশ্ন: কিন্তু, শিল্পের ওপর অর্থনীতি যে কর্তৃত্ব করছে, আপনার কি মনে হয় না এইটা প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে আপনি এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন?

মার্টিন পার: কেন প্রত্যাখ্যান করতে চান, আমি সেটার কোন কারণ দেখি না। বাণিজ্যই কিন্তু সব ঘটনা ঘটাইতেছে। যদি জনসংখ্যার এক শতাংশের কথা ধরে বলা যায়, তবে তাদের কেউই সরকারি ভর্তুকি পাওয়া ঘেট্টোতে বসবাস করতে রাজি হবে না। ফটোগ্রাফিরই সেই ক্ষমতা আছে যে সে একইসাথে গণতান্ত্রিক, বাছ বিচারহীন, এমনকি মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্যও হতে পারে। যদি আপনার ঘেট্টো’র বাইরে বের হয়ে আসতে হয়, তাহলে আপনাকে বাণিজ্যিক বৃত্তের মধ্যে ঢুকতেই হবে। এই যে ফ্যাশন জগতের মানুষগুলা, বিজ্ঞাপন, পোস্টার, বিলবোর্ড এইগুলোতে আর কি। আর এইগুলাও আসলে আরেক ধরনের ঘেট্টো। এই দলটা আকারে একটু বড় আর কি। আপনি এইটাও বলতে পারেন যে, ভিজ্যুয়াল কালচারটাও একটা ঘেট্টো, কিন্তু আমাদের অবস্থান এইটার ভিতরেই। আপনি যদি পশ্চিমা দুনিয়াতে থাকেন, দেখবেন সেইখানে কেউই এইটার বাইরে না। আমাদের দুনিয়ার চারপাশ চিত্র দিয়ে ঘেরা, সেইটা অ্যাডভার্টাইজিংই হোক, আর ফ্যামিলি স্ন্যাপশটই হোক। মাথায় রাখা দরকার সবাই কিন্তু এখন ফটোগ্রাফার। এইটা অবশ্যই ফটোগ্রাফির একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। আর, সবসময়ই এর দর্শক বাড়া দরকার আর লোকজন যখন ফটোগ্রাফির ব্যবহার শুরুই করে, তখন এর মাঝে একটু বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করলে খারাপ কি!

প্রশ্ন: এইসব ‘ইমেজ ফ্লো’ এর বেশিরভাগই তো খুব গতানুগতিক, আপনি প্রায়ই এই বিষয়ে প্রপাগান্ডা শব্দটা ব্যবহার করেন। একটু ভেঙে বলবেন, এইটা দিয়ে আপনি কি বোঝাতে চান?

মার্টিন পার: যেসব ইমেজ আমরা দেখি তার বেশির ভাগই এক ধরনের প্রপাগান্ডা, কারণ প্রতিটা ইমেজেরই একটা এজেন্ডা থাকে। বিজ্ঞাপনী কিংবা বাণিজ্যিক জগতের ক্ষেত্রে কেবল বিক্রি হওয়াটাই ফটোগ্রাফির একমাত্র উপযোগিতা, যদিও সকল ফটোগ্রাফিরই একটা এজেন্ডা থাকে। অথবা ফ্যামিলি স্ন্যাপশটের ক্ষেত্রে বিষয়টা হল একটা ‘পারফেক্ট ফ্যামিলির’ ধারণা বিক্রি করা। আমি এইটা বলছি না যে, ইনডিপেন্ডেন্ট ফটোগ্রাফারদের কোন এজেন্ডা নাই, কারণ নিশ্চিতভাবে তাদেরও একটা এজেন্ডা থাকেঃ আপনি দুইজন ফটোগ্রাফারকে একই শহরে পাঠিয়ে দেখতে পারেন, দেখবেন তারা দুইজনই একে অপরের থেকে একদমই ভিন্ন কাজ নিয়ে আসবে। দেখা যাবে একজনের কাজ হবে খুবই ইতিবাচক, আরেকজনেরটা হবে একেবারেই নেতিবাচক।

প্রশ্ন: অনেক শিল্পীই ইদানিং ফটোগ্রাফিকে একটা কনসেপচুয়াল মিডিয়াম হিশাবে ব্যবহার করেনঃ বোঝাই যায় যে, তারা ছবিটার ব্যাপারে আগ্রহী এবং সেই ছবির প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। কিন্তু তারা সেই ছবির গঠন কিংবা কৌশলগত বিষয়ে খুব দৃঢ়ভাবে আগ্রহী হননা, এমনকি ফটোগ্রাফির ইতিহাস এবং সেখানে তাদের অবস্থানের ব্যাপারেও না। একটু আগেই আপনি বললেন, ছবি তোলাটা এখন খুব সহজ, সেটাও একটা কারণ। আপনি কি খেয়াল করেছেন, কিংবা ভেবেছেন যখন ফটোগ্রাফি শিল্প জগতের সাথে মিশে গেছে, তখনই কিছু একটা পরিবর্তন ঘটেছে?
মার্টিন পার: নিশ্চিতভাবে। এখন যেভাবে আপনারা ফটোগ্রাফিকে দেখেন, তাতে একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটে গেছে। দশ বছর আগেও টেট গ্যালারি ফটোগ্রাফ কিনত না, যদি না সেটা একজন শিল্পীর করা হত, কিন্তু এখন তারা অন্যান্য লোকজনের কাছ থেকে ছবি কেনে এমনকি আমার মত লোকের কাছ থেকেও। এইটা তাদের পরিচালনা নীতির বিশাল পরিবর্তন। এখন যদি আপনি একটা আর্ট ফেয়ারে যান, এক তৃতীয়াংশ ছবিই হল ফটোগ্রাফি।

প্রশ্ন: ডকুমেন্টরি ফটোগ্রাফারদের লক্ষ্য কিভাবে পরিবর্তন হচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?

মার্টিন পার: লাইফ ম্যাগাজিন কিংবা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এর কালার সাপ্লিমেন্টগুলোর মত প্রচলিত যেসব ফটোজার্নালিস্টিক পত্রিকাগুলো ছিল এগুলোর কাটতি ক্রমশ পড়তির দিকে। ফলে আপনি যদি একজন ফটোজার্নালিস্ট হন (মনে রাখবেন আমি কিন্তু একজন ফটোজার্নালিস্ট না), আপনাকে অনেক পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। আপনার সামনে এগোনোর জন্য দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে। আর আপনার যদি শক্তিশালী কাজ থাকে তাহলে বিশ্বাস রাখতে হবে যে কিছু মানুষ আছে যারা আপনার ছবি ছাপাবে। কিন্তু আপনার কমিশন পাওয়া এবং পত্রিকার কাজ ছাপানো তার থেকে অনেক কঠিন। সে জন্যই ম্যাগনামের মত এজেন্সিগুলো বেশ ভাল করছে কারণ তারা এটা বুঝতে পারছে যে, ফটোগ্রাফির ভবিষ্যৎ শুধু পত্রিকার পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটার সাথে মিউজিয়াম কিংবা ভ্রাম্যমান প্রদর্শনীর মত অন্যান্য কালচারাল ভেন্যুও যুক্ত হবে।

সংকলন- মুনেম ওয়াসিফ ও তানজিম ওয়াহাব